শৃঙ্খলা শব্দটি শুনিতে যত সাধারণ, তাহার অন্তর্নিহিত অর্থ তত গভীর। ব্যক্তিজীবন হইতে রাষ্ট্র, সমাজ হইতে প্রকৃতি, অণু হইতে নক্ষত্রপুঞ্জ—সর্বত্রই অস্তিত্ব টিকিয়া আছে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম, ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণের উপর। সেই নিয়ম ভাঙিলে বিশৃঙ্খলা জন্মে, আর বিশৃঙ্খলা দীর্ঘস্থায়ী হইলে ধ্বংস অনিবার্য হইয়া উঠে। সাম্প্রতিক সময়ে দলীয় নেতাকর্মীদের একাংশের বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি, হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান তাই কেবল একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ বিষয় নহে, ইহা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার বৃহত্তর প্রশ্নের সহিতও সম্পর্কিত। রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় দলীয় সংসদ সদস্যের পদত্যাগ, কয়েকটি কমিটি বিলুপ্ত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রীর যে বার্তা স্পষ্ট হইয়াছে, তাহা হইল—দলীয় পরিচয় অপরাধের রক্ষাকবচ হইতে পারে না।
বস্তুত, শৃঙ্খলা না থাকিলে একটি দল দল থাকে না, রাষ্ট্র রাষ্ট্র থাকে না, সমাজ সমাজ থাকে না। একটি পরিবারেও যদি প্রত্যেকে নিজের ইচ্ছাকে সর্বোচ্চ আইন মনে করে, তাহা হইলে সেইখানে শান্তি স্থায়ী হইতে পারে না। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই সত্য। আইন আছে; কিন্তু আইন মানিবার বাধ্যবাধকতা নাই—এমন রাষ্ট্র অল্প সময়েই ক্ষমতাবান ব্যক্তির ইচ্ছার নিকট বন্দি হইয়া পড়ে। তখন আইনের শাসনের স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রভাবের শাসন। এক জনের দখল অন্য জনের অধিকারে আঘাত করে, একজনের সহিংসতা বহু মানুষের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে। পদার্থবিজ্ঞান ও আমাদের এই সত্যেরই অন্য ভাষায় শিক্ষা দেয়। মহাকর্ষের নিয়ম যদি হঠাৎ অকার্যকর হইয়া যাইত, পৃথিবী তাহার কক্ষপথে থাকিত না। পরমাণুর অভ্যন্তরে কণাগুলির আচরণেও নির্দিষ্ট নিয়ম কাজ করে। সামান্য একটি নিয়মের বিচ্যুতি কখনও কখনও বিপুল পরিবর্তনের সূচনা করিতে পারে। অর্থাৎ অস্তিত্বের গভীরে বিশৃঙ্খলা নহে, নিয়মই স্থিতির ভিত্তি। শৃঙ্খলা নিজে নিজে স্থায়ী থাকে না। তাহাকে রক্ষা করিতে প্রতিষ্ঠান, আইন, নৈতিকতা, শিক্ষা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের প্রয়োজন হয়। রাষ্ট্র যদি অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়, আইন প্রয়োগে বৈষম্য করে কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়কে বিচারব্যবস্থার ঊর্ধ্বে স্থান দেয়, তাহা হইলে সামাজিক এনট্রপি (বিশৃঙ্খলার মাত্রা) বাড়িতে থাকে। তাহার ফল একসময় সর্বত্র দৃশ্যমান হয়।
দর্শনের দিক হইতেও শৃঙ্খলা মানবসভ্যতার অন্যতম মৌল ভিত্তি। গ্রিক দর্শনের ‘কসমস’ শব্দটির মধ্যেই নিহিত আছে সুশৃঙ্খল বিশ্বব্যবস্থার ধারণা। মানুষ প্রকৃতিকে জয় করিয়া সভ্যতা নির্মাণ করে নাই কেবল, প্রকৃতির নিয়ম বুঝিয়া তাহার সহিত সামঞ্জস্য স্থাপন করিয়াই সভ্যতার অগ্রযাত্রা সম্ভব করিয়াছে। আইন, নৈতিকতা, সামাজিক চুক্তি—সকলই মানুষের স্বেচ্ছাচারকে সীমার মধ্যে রাখিবার প্রচেষ্টা। অতএব, রাজনৈতিক দলের শৃঙ্খলা কেবল দলের ভাবমূর্তির প্রশ্ন নহে। ইহা রাষ্ট্রের নৈতিক কাঠামোরও প্রশ্ন। যে দলের নেতাকর্মী ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সুবিধার উপকরণ মনে করেন, তাহাদের নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে প্রশাসনেও সেই সংস্কৃতির ছায়া পড়িবে। ইহা অনুধাবন করিতে হইবে, শৃঙ্খলা মানে অন্ধ আনুগত্য নহে। শৃঙ্খলা মানে আইনের প্রতি আনুগত্য, দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠা এবং নিজের ক্ষমতার সীমা সম্পর্কে সচেতনতা।
প্রকৃতি আমাদের প্রতিদিনই শিক্ষা দেয়—নিয়ন্ত্রণহীন শক্তি ধ্বংস ডেকে আনে। বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রিত বলিয়াই আলো দেয়, আগুন নিয়ন্ত্রিত বলিয়াই রান্না হয়। শক্তি যখন নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখন তাহাই বিপর্যয়ের কারণ হয়। সুতরাং শৃঙ্খলাকে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্থায়ী নীতিতে পরিণত করা জরুরি। অভিযোগ উঠিবে, তদন্ত হইবে, অপরাধ প্রমাণিত হইলে ব্যবস্থা হইবে—এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকিতে হইবে। কারণ একটি সমাজের পতন সাধারণত এক দিনে ঘটে না। ছোট ছোট অনিয়ম যখন নিয়ন্ত্রণহীন হইয়া স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয়, তখনই ধ্বংসের বীজ অঙ্কুরিত হয়। আর শৃঙ্খলা সেই বীজকে অঙ্কুরিত হইতে না দেওয়ারই প্রথম প্রহরী। তাই শৃঙ্খলার প্রহরীকে কাজ করিতে দিতে হইবে।
