ইসরায়েলি নৃশংসতায় তিন বছরে ৮০০ ফিলিস্তিনি শিক্ষক নিহত

পুরো পশ্চিম তীর দখলের ডাক ইসরায়েলি মন্ত্রীর

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০০

গাজায় ইসরায়েলের চলমান নৃশংসতায় ৮ শতাধিক ফিলিস্তিনি শিক্ষক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ৩ হাজারের বেশি শিক্ষক বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এদিকে পুরো ভূখণ্ডই আমাদের, পশ্চিম তীর দখলের ডাক ইসরায়েলি মন্ত্রীর।

৫ অক্টোবর পালিত বিশ্ব শিক্ষক দিবসের আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে ফিলিস্তিনের শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গত তিন বছরে ৮০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি শিক্ষক নিহত এবং ৩৩০০ এর বেশি আহত হয়েছেন। আগ্রাসন ও পদ্ধতিগত লক্ষ্যবস্তুকরণের সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনি শিক্ষকরা শিক্ষার অধিকার রক্ষায় প্রকৃত সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। মন্ত্রণালয় জানায়, ১৭০ জনের বেশি শিক্ষক এখনো কঠোর পরিস্থিতিতে আটক রয়েছেন। এছাড়া ফিলিস্তিনিদের ক্লিয়ারেন্স রাজস্ব ইসরায়েল অব্যাহতভাবে আটকে রাখায় গুরুতর অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে, যা শিক্ষকদের আর্থিক ও মানসিক সুস্থতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলেও জানায় মন্ত্রণালয়। বোমা হামলা ও বাস্তুচ্যুতি সত্ত্বেও শিক্ষাদান চালিয়ে যাওয়ায় গাজার শিক্ষকদের প্রশংসা করেছে মন্ত্রণালয়। তারা বলেছে, শিক্ষকরা তাঁবু ও বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়কেন্দ্রকে শ্রেণিকক্ষে পরিণত করেছেন। ফলে, দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা শিক্ষার অধিকার রক্ষার পাশাপাশি নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যও লড়াই করছেন।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের বিমান হামলা শুরুর পর থেকে গাজা ও পশ্চিম তীরের শিক্ষা খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের ওপর নিয়মিত হামলা ও নানা ধরনের নির্যাতন চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে মন্ত্রণালয়। আটক থাকা শিক্ষকরা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এছাড়া, পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় শত শত তল্লাশিচৌকিতে চলাচলে বাধা ও হয়রানির কারণে শিক্ষকদের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। বিশেষ করে, হেবরনের দক্ষিণের মাসাফের ইয়াত্তা, মধ্য পশ্চিম তীরের আল-মুঘাইয়ির গ্রাম, জর্ডান উপত্যকা এবং ‘এরিয়া সি' হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোতে এ সমস্যা বেশি।

বিজ্ঞাপন ১৯৯৫ সালের অসলো-২ চুক্তির আওতায় পশ্চিম তীরকে এ, বি ও সি এই তিন এলাকায় ভাগ করা হয়। এরিয়া এ ফিলিস্তিনি বেসামরিক ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এরিয়া বি ফিলিস্তিনি বেসামরিক প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও নিরাপত্তার দায়িত্ব ইসরায়েলের হাতে। আর পশ্চিম তীরের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা নিয়ে গঠিত এরিয়া সি পুরোপুরি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফিলিস্তিনি শিক্ষকদের ওপর নির্যাতনের পাশাপাশি তাদের আর্থিক সংকটও বেড়েছে বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ইসরায়েল ফিলিস্তিনের করের অর্থ আটকে রাখায়
শিক্ষকদের আর্থিক ও মানসিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি করেছে তারা। 'ক্লিয়ারেন্স রেভিনিউ' নামে পরিচিত এই অর্থ আমদানি করা পণ্যের ওপর ফিলিস্তিনের হয়ে ইসরায়েল কর হিসেবে আদায় করে। ১৯৯৪ সালের প্যারিস প্রটোকল অনুযায়ী, ইসরায়েল এই অর্থ ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে। ফিলিস্তিনি সরকারের মোট রাজস্বের প্রায় ৫৬ শতাংশ আসে এই ক্লিয়ারেন্স রেভিনিউ থেকে। ফলে, এ অর্থ আটকে থাকায় সরকারি কর্মীদের বেতন দেওয়া, জনসেবা চালু রাখা এবং সরকারের বিভিন্ন দায় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

এদিকে অধিকৃত পশ্চিম তীরের ‘পুরো ভূখণ্ডই ইসরায়েলের' বলে দাবি করেছেন দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন গভীর। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে বিলুপ্ত করা এবং ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। ইসরায়েলের চ্যানেল ১৪-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কট্টর ডানপন্থি এই মন্ত্ৰী জানান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হলে তিনি পশ্চিম তীর ও গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের চলে যেতে চাপ দেবেন। তার দাবি, ৬০ শতাংশ ফিলিস্তিনি ‘দেশত্যাগ’ করতে চায়। তিনি বলেন, আমি এতে সময় দেব এবং নিয়মিত বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করব। প্রতি সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনা করব। এ, বি ও সি এলাকার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। পুরো ভূখণ্ডই আমাদের। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে একাধিকবার বিতর্কিত বক্তব্য দেওয়া বেন গভীর অধিকৃত এলাকায় ইসরায়েলি সেনা পাঠানোর কৌশল প্রসঙ্গে বলেন, বিষয়টি খুব সহজ: আপনি সেনাদের যত বেশি গুলি চালানো ও বলপ্রয়োগের অনুমতি দেবেন, তত কম জনবলের প্রয়োজন হবে। আমি আমাদের সেনাদের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেব। পরিকল্পিতভাবে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করার নীতিতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘যথেষ্ট ইচ্ছা ছিল না' বলেও সমালোচনা করেন বেন গভীর।

আগামী ২৭ অক্টোবরের নেসেট নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি এসব মন্তব্য করলেন। ইহুদিদের সুকোট উৎসব চলাকালে জেরুজালেম ও হেব্রনের মুসলিম পবিত্র স্থানগুলোতে ইসরায়েলিদের প্রবেশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর অন্তত ৯৬৬ জন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী পূর্ব জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে ধর্মীয় আচার পালন করে। এতে বেন গভীর নিজেও অংশ নেন।

এর আগে আল-আকসার নিচের সুড়ঙ্গ পরিদর্শন করে নেতানিয়াহু বলেন, আমরা এখানে আছি এবং সবসময় এখানেই থাকব। ১৯৯৫ সালের ওসলো চুক্তি অনুযায়ী পশ্চিম তীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত হলেও জাতিসংঘ একে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড হিসেবে গণ্য করে এবং ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকে বেআইনি বলে মনে করে।

ইত্তেফাক/এনএন