ব্যাংকগুলোতে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমছে না। পরিবর্তন আসছে কাঠামোতে। এজন্য ব্যাংকে একক পরিবারের নিয়ন্ত্রণ কমাতে ব্যাংক কোম্পানি আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বেশ কিছু ছাড় দিতে যাচ্ছে সরকার। এর ফলে পর্ষদে একই পরিবার থেকে সর্বোচ্চ তিন জন পরিচালক রাখার বিদ্যমান নিয়ম অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা সর্বশেষ খসড়ায়, একই পরিবার থেকে পরিচালকের সংখ্যা তিন জন থেকে কমিয়ে দুই জন করা এবং টানা সর্বোচ্চ মেয়াদ ১২ বছর থেকে কমিয়ে ছয় বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) দুটি প্রস্তাবই পরিবর্তন করতে বলেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) এবং অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে ‘ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন ২০২৬’-এর খসড়া পুনর্বিবেচনা করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিবারকেন্দ্রিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধান বহাল রেখে, খসড়াটি পুনর্গঠন করে আবার মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে বলা হয়েছে।
পাশাপাশি খেলাপি ঋণ থাকা পরিচালকদের ক্ষেত্রেও নিয়ম শিথিল করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতার ধারায় পরিবর্তনের কথা ভাবা হচ্ছে। এসব পরিবর্তন এনে খসড়া চূড়ান্ত করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
ব্যাংকগুলোতে পারিবারিক আধিপত্য কমাতে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে ২০২৫ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সে অনুযায়ী, সংশোধিত আইনের খসড়া প্রস্তুত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেখানে পারিবারিক আধিপত্য কমানো এবং পরিচালকদের মেয়াদ কমানোর বিষয়গুলো ছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনটি সংশোধন নিয়ে গত ৮ এপ্রিল, ২২ এপ্রিল ও ১২ জুলাই তিনটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব সভার আলোচনার ভিত্তিতে খসড়ায় বিভিন্ন সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজন করে, তা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ভিত্তিতে গত ২০ সেপ্টেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক পর্যালোচনা বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। বৈঠকে উপস্থিত প্রতিনিধিরা ব্যাংকের পর্ষদে একই পরিবারের সর্বোচ্চ তিন জনকে পরিচালক হিসেবে রাখার বিধান বহাল রাখার বিষয়ে একমত হন। তবে টানা মেয়াদের ক্ষেত্রে বর্তমান ১২ বছরের স্থলে ৯ বছর করার বিষয়ে তারা সম্মতি প্রকাশ করেন বলে জানা গেছে।
উক্ত বৈঠকে আইন ও বিচার বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বিএবি, বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ-সহ ১৭টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ, ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং ব্যবসার স্থিতিশীলতার কথা বিবেচনায় রেখে কঠোর প্রস্তাবগুলোর কয়েকটি শিথিল করার বিষয়ে অংশগ্রহণকারীরা সম্মত হয়েছেন।
ব্যাংক-কোম্পানি আইনের ১৫(১০) ধারা অনুযায়ী, বর্তমানে একই পরিবারের সর্বোচ্চ তিন জন সদস্য একই সময়ে একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকতে পারেন। এর বাইরে ঐ পরিবারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বা নিয়ন্ত্রণাধীন সর্বোচ্চ দুটি প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির পক্ষে প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে বিএবিসহ কয়েকটি পক্ষ বর্তমানের তিন জনের সীমা বহাল রাখার বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ করেছে। ফলে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমানোর পরিকল্পনা টিকছে না। পরিচালকদের মেয়াদের ক্ষেত্রে, ২০১৮ সালে একটানা মেয়াদের সীমা ছয় বছর থেকে বাড়িয়ে ১২ বছর করা হয়েছিল। ২০২৩ সালের সংশোধনীতেও ঐ ১২ বছরের মেয়াদ রেখে দেওয়া হয়, যেখানে ১২ বছর পর তিন বছরের বিরতি শেষে পুনরায় ফেরার বিধান ছিল। তবে এবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রস্তাবিত ছয় বছরের মেয়াদের বিরোধিতা করে বিএবি। বিএবির পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, পরিচালকদের মেয়াদ কমিয়ে দিলে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অভিজ্ঞতার ঘাটতি তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে যুক্ত এবং অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন পরিচালকদের ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও সভায় তুলে ধরা হয়। খসড়ায় ব্যাংকে কৌশলগত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১০ শতাংশ পরিশোধিত মূলধনের সীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, তবে এ ধরনের বিনিয়োগে সরকারি অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা রাখা হচ্ছে।
এছাড়া নতুন ব্যবস্থায় পরিচালনা পর্ষদ বহাল রেখেই প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ রাখা হতে পারে। এর ফলে প্রয়োজন হলে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে পুরোপুরি বাতিল না করেও প্রশাসকের মাধ্যমে ব্যাংকের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংককে সংশোধিত খসড়া চূড়ান্ত করে পাঠাতে বলা হয়েছে। এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং, মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন এবং জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
