অ্যানথ্রপিকের সাবেক গবেষকের হুঁশিয়ারি

আগামী বছরের মধ্যেই ‘ভয়ংকর’ হয়ে উঠবে এআই

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৪৮

২০২৭ সালকে সামনে রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অতি-দ্রুত উন্নয়ন এবং একের পর এক নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা নতুন এক আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিকের সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সন সতর্ক করে বলেছেন, পর্যাপ্ত সেফগার্ড ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিকাশমান 'সুপারইন্টেলিজেন্ট' প্রযুক্তি তৈরির অন্ধ প্রতিযোগিতায় নেমেছে শীর্ষ কোম্পানিগুলো, যা পুরো মানবজাতির অস্তিত্বকে এক চরম সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘দ্য ডেইলি শো’তে সঞ্চালক জন স্টুয়ার্টের মুখোমুখি হয়ে এবং পরবর্তীতে নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের এক নীতিনির্ধারণী শুনানিতে অংশ নিয়ে ২৮ বছর বয়সী এই গবেষক এআই প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত বিকাশ বন্ধে অবিলম্বে বিশ্বব্যাপী সরকারি হস্তক্ষেপের দাবি জানান।

টকশোতে কক্সন জানান, ওপেনএআইতে তিন বছর গবেষক হিসেবে কাজ করার পর কৌতূহল থেকে তিনি অ্যানথ্রোপিকে যোগ দিয়েছিলেন। এই সময়ে দুটি বড় ঘটনা তার ভেতরে গভীর আতঙ্কের জন্ম দেয়। প্রথমটি হলো মডেলগুলোর বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধির অবিশ্বাস্য হার এবং দ্বিতীয়টি হলো ওপেনএআই-এর সাম্প্রতিক একটি সাইবার নিরাপত্তা দুর্ঘটনা।

এআই মডেলগুলোর ‘ক্ষমতা বৃদ্ধির হারের’ আলোকে যেসব এআই মডেল আগামী বছর বা আগামী বছরের শুরুতে প্রশিক্ষিত হবে, সেগুলো কতটা বুদ্ধিমান হবে তার দিকে ইঙ্গিত করে কক্সন বলেন, ‘সেগুলো হতে যাচ্ছে খুব, খুবই বুদ্ধিমান। আর সেটার সঙ্গে ওপেনএআই হ্যাকিংয়ের ঘটনা মিলালে আপনি বিষয়টি বুঝতে পারবেন। এটা বেশ ভয়ংকর।’

সংবাদমাধ্যম নিউজউইকের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত জুলাই মাসে ওপেনএআই-এর অভ্যন্তরীণ সাইবার নিরাপত্তা মূল্যায়নের সময় ‘ওপেনএআই হাগিং ফেস’ নামক এক আশঙ্কাজনক ঘটনা ঘটে। কম নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অবস্থায় থাকা একাধিক এআই মডেল নিজেদের ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন রাখার নির্ধারিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসে। মডেলগুলো কোনো মানুষের নির্দেশ ছাড়াই অননুমোদিত উপায়ে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে, সিস্টেমে থাকা দুর্বলতার সুযোগ নেয় এবং নিজেদের গবেষণা পরিবেশের সীমানা পেরিয়ে এআই প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসে কম্পিউটার সিস্টেমে ঢুকে পড়ে।

ওপেনএআই ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে এই ঘটনাকে সমগ্র এআই শিল্পের জন্য ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, নির্দিষ্ট সুরক্ষাকবচ না থাকলে এআই মডেলগুলো কতটা স্বয়ংক্রিয়, অধ্যবসায়ী এবং ক্ষতিকর পদক্ষেপ নিতে সক্ষম, তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট। যদিও ঘটনাটি একটি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষাগারে ঘটেছিল, এর পর থেকে মডেল উন্নয়ন ও ইন্টারনেট সংযোগের ওপর নজরদারি এবং স্যান্ডবক্স পরিবেশ আরও কঠোর করা হয়েছে। এই ঘটনাটির প্রসঙ্গ টেনে কক্সন বলেন, ‘এআই এজেন্টগুলো যেভাবে হ্যাক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’

গত ৫ অক্টোবর নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের এক শুনানিতে উপস্থিত হয়ে নীতি নির্ধারকদের সতর্ক করেন কক্সন। শুনানিতে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনও জানি না কীভাবে কোনো এআই সিস্টেমকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।’ তিনি স্পষ্ট জানান, সাময়িকভাবে এআই বন্ধ করার ‘কিল সুইচ’ (Kill switch) ব্যবস্থাগুলো দীর্ঘমেয়াদে কোনো সমাধান দেবে না। তাই ফ্রন্টিয়ার এআই মডেল উন্নয়নের গতি কমানো ছাড়া উপায় নেই। সিটি কাউন্সিলের স্পিকার জুলি মেনিন হুইসেলব্লোয়ারদের সুরক্ষা প্রদান ও এআই নিয়ন্ত্রণে নতুন আইনি কাঠামো গঠনের প্রস্তাব এনেছেন।

অন্যদিকে, মার্কিন ফেডারেল পর্যায় ও ওয়াশিংটনে বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স ফোর্স’ (এসআইএফ) নামে একটি নতুন ফেডারেল টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। আমেরিকার এই বিশেষ টিমে ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স জে ক্লেটন, এফটিসি চেয়ারম্যান অ্যান্ড্রিউ ফার্গুসন এবং ডিফেন্স ডিপার্টমেন্টের টেকনোলজি অফিসার এমিল মাইকেলের মতো শীর্ষ ব্যক্তিরা রয়েছেন—যা জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বজায় রাখার বড় পদক্ষেপ।

দ্য ডেইলি শোতে কক্সন মন্তব্য করেন, ‘ভবিষ্যতে কোনো প্রথাগত চাকরি থাকবে না। এআই প্রস্তুতকারকরা মূলত এমন একটি জগতের কল্পনাই করছেন।’ তিনি ইঙ্গিত দেন, মানুষের সমস্ত দৈহিক ও মানসিক শ্রম যখন স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির হাতে চলে যাবে, তখন সেই অর্থনৈতিক উৎপাদনের ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ ‘ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম’-এর মতো কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বণ্টন করা সম্ভব হবে।

 

ইত্তেফাক/এসএইচ