মানুষের যন্ত্রণায় শুধু ঠিকানা নয়, গলার স্বরও বদলাচ্ছে হিমালয়ের পাখি মোনাল

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২:৩৩

মানুষের কর্মকাণ্ডের বিস্তারের প্রভাব পড়ছে হিমালয়ের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন পাখি মোনালের জীবনযাপন ও যোগাযোগব্যবস্থায়। অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটন এবং বাড়তে থাকা শব্দদূষণের কারণে পাখিটির আবাসস্থল বদলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নিজেদের ডাক অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতে কণ্ঠের ধরনেও পরিবর্তন আনছে তারা।

ভারতীয় গবেষকদের পাঁচ বছর ধরে পরিচালিত দুটি পৃথক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, মানুষের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির কারণে মোনাল পাহাড়ের আরও উঁচু এলাকায় সরে যাচ্ছে। অন্যদিকে কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে সঙ্গী ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে তারা অপেক্ষাকৃত তীক্ষ্ণ স্বরে ডাকছে।

হিমালয়ের পাহাড়ি বনের এই পাখিটি অঞ্চলটির সংস্কৃতি ও পরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। মোনালের পুরুষ পাখির সবুজ, নীল ও তামাটে রঙের নজরকাড়া পালক রয়েছে। এটি ভারতের উত্তরাখণ্ডের রাজ্য পাখি এবং নেপালের জাতীয় পাখি।

গবেষণার অন্যতম প্রধান গবেষক ড. রাজীব লোচন জানান, মোনালের আবাসস্থলের পরিসর তুলনামূলকভাবে ছোট। ঋতুভেদে পাখিটি পাহাড়ের নিচের ঢাল থেকে উঁচু আলপাইন অঞ্চলে চলাচল করে। এ কারণে উত্তর-পশ্চিম হিমালয়ের বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে মোনালকে বিবেচনা করা হয়।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, গাছের সীমানার ওপরে থাকা মোনালের প্রাকৃতিক আবাসস্থলে মানুষের উপস্থিতি বেড়ে যাওয়ায় পাখিগুলো আরও উঁচু এলাকায় সরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনও ভবিষ্যতে তাদের বাসস্থানকে আরও সংকুচিত ও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।

গবেষকেরা উত্তরাখণ্ড ও হিমাচল প্রদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মোনালের সম্ভাব্য আবাসস্থলের পরিবর্তন নিয়ে একটি মডেল তৈরি করেছেন। ড. লোচনের ভাষ্য, বরফ গলে যাওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ের উঁচু এলাকায় গাছপালা ছড়িয়ে পড়ায় সেসব স্থান ধীরে ধীরে মোনালের জন্য উপযোগী হয়ে উঠছে। অন্যদিকে মানুষের দখল ও কর্মকাণ্ডের কারণে নিচের স্বাভাবিক আবাসস্থল হারিয়ে তারা ওপরের দিকে সরে যাচ্ছে।

গবেষকদের আশঙ্কা, এভাবে আবাসস্থল পরিবর্তনের কারণে মোনালের ঋতুভিত্তিক চলাচল কঠিন হয়ে উঠতে পারে। পাখিগুলো ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন এলাকায় আটকে পড়লে তাদের প্রজনন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বিলুপ্তির ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

দ্বিতীয় গবেষণায় মোনালের কণ্ঠস্বর ও আচরণগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়। রাজীব লোচন, দীনেশ কুমার শর্মা ও আনন্দ কুমারের নেতৃত্বে উত্তরাখণ্ডের কেদারনাথ মাস্ক ডিয়ার স্যাংচুয়ারির দুটি উপত্যকায় গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এর মধ্যে চোপতা একটি ব্যস্ত পর্যটনকেন্দ্র, আর মদমহেশ্বর তুলনামূলক শান্ত এলাকা।

২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে এক বছর ধরে গবেষকেরা ৭০০টির বেশি মোনালের ডাক রেকর্ড করেন। এসব শব্দের তীক্ষ্ণতা, স্থায়িত্ব এবং আশপাশের শব্দের মাত্রা বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, শান্ত এলাকার তুলনায় কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে থাকা মোনাল অপেক্ষাকৃত তীক্ষ্ণ স্বরে ডাকছে।

ড. লোচন বলেন, এর অর্থ এই নয় যে মোনালের কণ্ঠে স্থায়ী বা বিবর্তনমূলক পরিবর্তন এসেছে। বরং গবেষণার তথ্য বলছে, ভিন্ন শব্দময় পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পাখিগুলো আচরণগতভাবে তাদের ডাকের ধরন বদলাচ্ছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মদমহেশ্বরের মোনালের তুলনায় চোপতার পাখিগুলো পর্যটক ও যানবাহনের শব্দের মধ্যে নিজেদের ডাক পৌঁছে দিতে অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট ডাকে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। গবেষকদের মতে, পাখির ডাক তাদের যোগাযোগ ও প্রজননের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হওয়ায় এ ধরনের আচরণগত পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে প্রজনন সফলতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

হিমালয়ের পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করা পরিবেশবিদ বিশাল সিং বলেন, দুটি গবেষণাই আরও অরক্ষিত প্রজাতির জন্য সতর্কবার্তা। তাঁর প্রশ্ন, একটি প্রজাতিকে যদি কণ্ঠস্বর ও আবাসস্থল—দুটিই বদলাতে হয়, তাহলে আরও সংবেদনশীল প্রজাতিগুলো কীভাবে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াচ্ছে?

ফ্লেম ইউনিভার্সিটির পাবলিক পলিসির অধ্যাপক ও আইপিসিসি প্রতিবেদনের কন্ট্রিবিউটর আঞ্জাল প্রকাশের মতে, পর্যটকদের গাড়ির শব্দের মধ্যে নিজেদের ডাক শোনাতে পাখিদের কণ্ঠের জোর বাড়ানো কিংবা মানুষের উপস্থিতির কারণে আরও উঁচু এলাকায় চলে যাওয়া হিমালয়ের জীববৈচিত্র্যের ওপর মানুষের চাপের স্পষ্ট ইঙ্গিত।

গবেষণা দুটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, মোনালের আবাসস্থল ও আচরণে পরিবর্তন হিমালয়ের বৃহত্তর পরিবেশগত পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। অধ্যাপক প্রকাশের ভাষায়, মোনালের ডাক যেন হিমালয়ের আরও জায়গা, নীরবতা ও যত্নের প্রয়োজনের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।

ইত্তেফাক/এসজেএস