বিশ্বের শহরগুলো যখন স্বাস্থ্যসেবা, গণপরিবহন, নগর ব্যবস্থাপনা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের রাজধানীসহ অন্যান্য শহরগুলো হাঁটছে উঠটো পথে। একের পর এক আন্তর্জাতিক বাসযোগ্যতা সূচকে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের শহরগুলো। শুধুমাত্র বিশাল অট্টালিকা কিংবা বড় অবকাঠামো কোনো শহরকে বাসযোগ্য উন্নত শহর হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না। এর সঙ্গে দূষণমুক্ত পরিবেশ, মানসম্মত নাগরিক সেবা, সুশাসন ও টেকসই অর্থনীতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু এসব সূচকে পিছিয়ে থাকায় বিশ্বের সেরা ৫০০ শহরের তালিকার তলানির দিকে জায়গা হয়েছে বাংলাদেশের শহরগুলোর। বরং বছরের ব্যবধানে দেশের বড় শহরগুলোর বৈশ্বিক অবস্থান আরো নিচে নেমেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্বাধীন অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের ২০২৬ সালের গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্সে বিশ্বের ১৬৩টি দেশের এক হাজার শহরকে পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়েছে। তালিকায় বাংলাদেশের আটটি শহরের মধ্যে এগিয়ে থাকা ঢাকার অবস্থান ৫১৫তম। এ ইনডেক্সে গত বছর ঢাকা ছিল ৪৮২তম অবস্থানে। বছরের ব্যবধানে এ শহর পিছিয়েছে ৩৩ ধাপ।
ফলে বিশ্বের সেরা ৫০০ শহরের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ঢাকা। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের ৫ সূচকের মধ্যে আছে অর্থনীতি, মানবসম্পদ, জীবনযাত্রার মান, পরিবেশ ও শাসন ব্যবস্থা। ঢাকার সঙ্গে পিছিয়েছে দেশের অন্য বড় শহরগুলোও। গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি পিছিয়েছে রাজশাহী। ৬৬ ধাপ নেমে শহরটির অবস্থান এখন ৭৭৯তম। চট্টগ্রাম ১৪ ধাপ পিছিয়ে ৭৬৩তম হয়েছে। খুলনা রয়েছে ৮১১তম, সিলেট ৮৩৪ ও ময়মনসিংহ ৮৯৫তম অবস্থানে। বগুড়া ৩২ ধাপ পিছিয়ে ৯২৬তম হয়েছে। বাংলাদেশের শহরগুলোর মধ্যে শুধু কুমিল্লা আগের বছরের অবস্থান ধরে রেখেছে। শহরটির অবস্থান ৮৮৩তম। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্সে অর্থনীতির জন্য সর্বোচ্চ ৩০, মানবসম্পদের জন্য ২৫, জীবনমানের জন্য ২৫ এবং পরিবেশ ও শাসন ব্যবস্থার জন্য ১০ করে মোট ১০০ নম্বর রাখা হয়েছে। প্রকাশ করা হয়েছে শুধু তালিকার শীর্ষে থাকা ১০০ শহরের স্কোর। বাংলাদেশের কোনো শহর এ তালিকায় না থাকায় সেগুলোর সামগ্রিক স্কোর উল্লেখ করা হয়নি।
চলতি বছরের বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে বাংলাদেশের শহরগুলোর অবস্থান অবনমন হলেও একই সময়ে বিশ্বের সব অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উন্নতি হয়েছে এশিয়ায়। অথচ বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অগ্রগতির পরিবর্তে উলটো টানা অবনতির ধারা অব্যাহত রয়েছে বাংলাদেশের শহরগুলোর। ঢাকার অবস্থান এক বছরের ব্যর্থতার ফল নয়। বরং গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে অবনতি হচ্ছে শহরটির। ২০২১ সালে ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল ১৩৭তম। ২০২২ সালে ১৭২টি শহরের মধ্যে ১৬৬তম। ২০২৩ সালেও ১৭৩টি শহরের মধ্যে একই অবস্থানে ছিল। ২০২৪ সালে আরো পিছিয়ে ১৬৮তম স্থানে নেমে যায়। ২০২৫ সালে অবস্থান হয় ১৭১তম।
শহরের সামগ্রিক অবস্থান নির্ধারণে অর্থনীতির আকার, কাঠামো ও প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষা, ব্যবসার পরিবেশ, জনমিতিক প্রবণতা, নাগরিকদের জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্য ও আর্থিক অবস্থা, নাগরিক সুবিধা, পরিবেশ, জলবায়ু ঝুঁকি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নাগরিক অধিকার বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের শহরগুলোর মধ্যে শুধু অর্থনীতির সূচকে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। বিশ্বে এ সূচকে ঢাকার অবস্থান ২৮৬তম। জিডিপির আকার ও প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, মাথাপিছু জিডিপি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ভিত্তিতে এ সূচক তৈরি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে চট্টগ্রাম ৭০২ ও ময়মনসিংহ ৭৩৪তম অবস্থানে রয়েছে। মানবসম্পদ সূচকেও ঢাকা দেশের অন্য শহরগুলোর তুলনায় এগিয়ে। এ সূচকে শহরটির অবস্থান ১৭৮তম। শিক্ষা, ব্যবসার পরিবেশ ও জনমিতিক প্রবণতার ভিত্তিতে এ মূল্যায়ন করা হয়। এরপর খুলনা ৫৪১ ও রাজশাহী ৫৯৯তম অবস্থানে রয়েছে। অর্থাত্ অর্থনীতি ও মানবসম্পদের মতো সূচকে ঢাকার অবস্থান তুলনামূলক ভালো হলেও পরিবেশসহ সামগ্রিক র্যাংকিংয়ে সেটি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
বিশ্বের ভালো শহরের তালিকায় দেশের শহরগুলোর দুর্বল অবস্থানের পেছনে পরিবেশ ও সুশাসনের ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ঢাকায় জনসংখ্যার চাপ, ঘনবসতি, দূষণ ও অপ্রতুল নাগরিক সুবিধা নগরজীবনের মান কমিয়ে দিচ্ছে। আবাসনের প্রয়োজন বাড়লেও পরিকল্পিতভাবে সেই চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। দেশের বড় শহরগুলোয় ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। এর ফলে শহর দিনে ও রাতে অতিরিক্ত উত্তপ্ত থাকে। শহরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মানুষের স্বাভাবিক কাজের সক্ষমতা কমার পাশাপাশি ডেঙ্গু, হামসহ বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাবও বাড়তে পারে। ফলে এর প্রভাব পড়ে শহরের মানুষের সামগ্রিক জীবনমানের ওপর। সামগ্রিকভাবে ভালো শহরের কাতারে যেতে টেকসই পরিবেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যদিও এক্ষেত্রে বাংলাদেশের শহরগুলোর পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে।
