নেকাব পরা ছাত্রীকে ‘মৌলবাদী’ বলার অভিযোগ, ঢাবি শিক্ষককে সব ক্লাস থেকে অব্যাহতি

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:২৬

নেকাব পরা এক ছাত্রীকে ‘মৌলবাদী’, ‘জঙ্গি’ ও ‘বোমা মারতে পারে’—এমন মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বিরুদ্ধে। শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই শিক্ষককে সব ধরনের ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিভাগীয় একাডেমিক কমিটি। একই সঙ্গে তার কোর্সগুলো অন্য শিক্ষকদের মধ্যে পুনর্বণ্টন করা হবে।

বুধবার (৭ অক্টোবর) ইংরেজি বিভাগের ১৫তম ব্যাচের (২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ) একটি ক্লাসে ঘটনাটি ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। পরে কয়েকজন শিক্ষার্থী লিখিতভাবে বিভাগীয় চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি একাডেমিক কমিটির সভা ডেকে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। 

বিষয়টি নিশ্চিত করে ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তাজিন আজিজ চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে জরুরি একাডেমিক কমিটির সভা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সভায় একটি রেজুলেশন নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের কোর্সগুলো পুনর্বণ্টন করে অন্য শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। বিভাগীয় চেয়ারম্যান বা একাডেমিক কমিটির এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই।

অধ্যাপক তাজিন আজিজ চৌধুরী আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের বিষয়ে উপাচার্য, একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেট প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে। বিভাগ থেকে ঘটনাটি তাদের অবহিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হবে।

শিক্ষার্থীর অভিযোগ

মল্লিকা বলেন, “শিক্ষক আমাকে একপর্যায়ে বলেন, ‘তুমি এখানে বসে থাকলে আমার আনকমফোর্টেবল ফিল হচ্ছে, আমার আনসেফ ফিল হইতেছে। আমি চাচ্ছি যে তুমি ক্রাউডের মধ্যে গিয়ে বসো।’ এরপর তিনি ক্লাস থেকে বের হয়ে যান।’’

মল্লিকার অভিযোগ, নেকাব ও হিজাব নিয়ে এর আগেও ওই শিক্ষকের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয়েছে। শিক্ষক তার পোশাক নিয়ে প্রশ্ন করেছেন এবং কেন এভাবে পোশাক পরেছেন, তা জানতে চেয়েছেন। এ সময় শিক্ষক নিজের হজ করার বিষয় উল্লেখ করে সেখানে মুখ খোলা রাখা যায় বলেও মন্তব্য করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

এর আগের একটি ক্লাসে শিক্ষক তাকে মুখ ঢেকে এভাবে চললে নেকাব খুলে দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেন মল্লিকা। তিনি বলেন, শিক্ষক তাকে বলেছেন, তিনি জানেন না ওই শিক্ষার্থীকে। তখন তিনি অফিস আওয়ারে দেখা করে নিজের পরিচয় নিশ্চিত করার এবং পরিচয়পত্র দেখানোর প্রস্তাব দেন। 

তবে এরপরও প্রতিদিন তাকে শনাক্ত করার বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক আপত্তি জানিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন মল্লিকা। তার দাবি, বুধবারের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়; বরং নিকাব ও পোশাক নিয়ে শিক্ষকের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

‘জঙ্গি’ ও ‘বোমা মারতে পারে’ মন্তব্যের অভিযোগ

ইংরেজি বিভাগের ১৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাইসা মণি সুমিও ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ক্লাসে ইসলামবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ করেন। তার দাবি, ঘটনার দিন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পোশাক নিয়ে শিক্ষককে তিনি বলেন, ওই শিক্ষার্থী একটি নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণ করেন বলেই এভাবে পর্দা করেন।

সুমির অভিযোগ, এ সময় শিক্ষক কোনো মাযহাব না মানার বিষয়ে মন্তব্য করেন এবং ইসলাম পালনের ক্ষেত্রে হজ, নামাজ, রোজা ও যাকাতের প্রসঙ্গ তোলেন। পরে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে সমর্থন করার কারণে তার প্রতিও শিক্ষক ক্ষুব্ধ হন বলে দাবি করেন সুমি।

সুমির ভাষ্য, একপর্যায়ে শিক্ষক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে ‘জঙ্গি’ এবং তিনি ‘বোমা মারতে পারেন’- এমন মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, আফগানিস্তান ও ফিলিস্তিনের মানুষের পোশাকের ভিন্নতার উদাহরণ দিয়ে পর্দার ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যের কথা বললেও শিক্ষক তাকে কথা বলার সুযোগ দেননি।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ওই ক্লাসে পোশাকের সীমা নিয়েও শিক্ষক মন্তব্য করেন। এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী ক্লাস থেকে বের হয়ে যান বলে দাবি করেন সুমি।

অভিযুক্ত শিক্ষক শিক্ষার্থীদের হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সুমির দাবি, শিক্ষক নিজেকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান হিসেবে উল্লেখ করে কেউ তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না- এমন কথাও বলেছেন। একই সঙ্গে ক্লাসের বড় একটি অংশে শিক্ষক নিজের পরিবারের বিষয়ে কথা বলেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য

ঘটনার দিন বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, বিভাগের পক্ষ থেকে তাকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং পরদিন জরুরি একাডেমিক কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে।

এরপর শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার বিভাগের জরুরি একাডেমিক কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের কোর্সগুলো পুনর্বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক তাসনিম সিরাজ মাহবুবের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

ইত্তেফাক/আরএইচ