বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে: ইস্তান্বুল সামিটে আইনমন্ত্রী

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, মানবাধিকার সুরক্ষা, অভিবাসন, সাইবার অপরাধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের ফলে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জসহ বৈশ্বিক নানা সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের দেশগুলোকে অভিন্ন দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে এবং কার্যকর ও সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

মঙ্গলবার তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ‘আন্তর্জাতিক জাস্টিস সামিট-ইস্তান্বুল, ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এ আহ্বান করেন বলে আইন মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আজ জানানো হয়।

আইনমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক আইনি ব্যবস্থা বর্তমানে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ একদিকে বিশ্বকে সংযুক্ত করেছে এবং সেবা প্রদানকে সহজ করেছে, অন্যদিকে নতুন ধরনের বৈষম্য, বিভাজন ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু নতুন আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। বরং ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও অভিন্ন দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সে সময় বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ১ হাজার ৪শ’র বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই ছিলেন শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষ, যারা চাকরি ও সরকারি সেবায় বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছিলেন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনেও এসব ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার দেশে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ প্রায় ১২ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে, যা দেশের সম্পদ, পরিবেশ, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশ একা এই বৈশ্বিক বোঝা বহন করতে পারে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত দায়িত্বের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান করতে হবে এবং রোহিঙ্গাদের মর্যাদা, নাগরিকত্ব ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে। এ সময় তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুতে তুরস্কের ফার্স্ট লেডির সফরসহ সংকটের শুরু থেকেই দেশটির অব্যাহত সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধ, ক্ষতিকর কনটেন্ট, বিভ্রান্তিকর তথ্য, অপপ্রচার ও অ্যালগরিদমিক পক্ষপাতের মতো নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এসব সমস্যার কোনো সীমান্ত নেই। তাই কোনো দেশের একক আইন দিয়ে আন্তঃসীমান্ত প্রযুক্তি কোম্পানি বা ডিজিটাল অপরাধ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ সাইবার অপরাধ মোকাবিলার পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও অধিকার সুরক্ষায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এ ধরনের বৈশ্বিক সমস্যার কার্যকর সমাধানের জন্য সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে প্রকৃত অংশীদারত্বের ভিত্তিতে প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, ফরেনসিক জ্ঞান এবং আইন ও বিচারসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ, সীমান্ত নির্ধারণ, জ্বালানি বাজার, মেধাস্বত্ব ও চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তঃসীমান্ত বিরোধ দ্রুত বাড়ছে। এসব বিরোধ নিষ্পত্তিতে আন্তর্জাতিক সালিশি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তিকে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মৌলিক নীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও শক্তিশালী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির আইনি কাঠামো আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা সবার জন্য সাশ্রয়ী, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত হওয়া প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ন্যায়বিচার কখনো এমন হতে পারে না, যা শুধু ক্ষমতাবানদের নাগালের মধ্যে থাকে।

চমকপ্রদ বড় ঘোষণার পরিবর্তে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়ে আইনমন্ত্রী আরও বলেন, বিশ্ব এখন অপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্যে ক্লান্ত। তাই এমন বৈশ্বিক দায়িত্ববণ্টন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যার মাধ্যমে এককভাবে সমাধান অযোগ্য চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব হয়।

উল্লেখ্য, ৮ ও ৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক জাস্টিস সামিটে বিশ্বের ৭৫টি দেশের বিচারমন্ত্রী, বিচারক, আইনবিদ ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নিচ্ছেন।

ইত্তেফাক/এএম