এনসিটি নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তিতে কী রয়েছে, জানালেন আশিক চৌধুরী

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৪

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দিতে চুক্তি করেছে সরকার। ১৫ বছরের এই চুক্তিতে টার্মিনাল আধুনিকায়নে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ, শুরুতেই প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অগ্রিম ফি প্রদান, রাজস্বের অংশ দেওয়া এবং নির্ধারিত দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে আর্থিক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় চুক্তিটি সই হয়। শ্রমিক সংগঠনসহ বিভিন্ন পক্ষের আপত্তির মধ্যেই এনসিটির পরিচালনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এই চুক্তি করেছে সরকার।

চুক্তির বিভিন্ন শর্ত তুলে ধরে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বৃহস্পতিবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দেন।

পোস্টে তিনি জানান, ‘চুক্তি অনুযায়ী, এনসিটির পরিচালনার মেয়াদ ১৫ বছর। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে উভয় পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে সমঝোতা না হলে তা কার্যকর হবে না এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আলোচনার প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে পারবে।’

আশিক মাহমুদ জানান, চুক্তির শুরুতেই ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি দেবে। পাশাপাশি টার্মিনাল আধুনিকায়নে প্রতিষ্ঠানটি ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

চুক্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য ন্যূনতম পরিমাণ সুরক্ষা বা মিনিমাম ভলিউম গ্যারান্টির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।

রাজস্ব ভাগাভাগির বিষয়ে আশিক মাহমুদ বলেন, টার্মিনালের গড় আয় অনুযায়ী প্রতি টিইইউ কনটেইনারে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রয়্যালটি বা রাজস্বের অংশ পাবে। এর পাশাপাশি অপারেটরকে প্রতিবছর বন্দর কর্তৃপক্ষকে একটি নির্ধারিত ফি দিতে হবে।

চুক্তিতে অপারেটরের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার জন্য নির্দিষ্ট কর্মদক্ষতা সূচক (কী পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর আওতায় বন্দরে ট্রাকের অবস্থানকাল এবং ক্রেনের উৎপাদনশীলতার মতো বিষয়গুলোতে নির্ধারিত উন্নতি অর্জন করতে হবে।

আশিক মাহমুদ জানান, টানা তিন মাস নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে ব্যর্থ হলে অপারেটরের ওপর আর্থিক জরিমানা আরোপ করা হবে।

বন্দরের কর্মীদের চাকরি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও চুক্তির নির্দিষ্ট ধারার মাধ্যমে সুরক্ষিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

চুক্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালনাগত তদারকি অব্যাহত রাখার বিষয়টিও রাখা হয়েছে। টার্মিনাল এলাকায় সার্বক্ষণিক সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ থাকবে। পাশাপাশি অপারেটরকে প্রতি সপ্তাহ ও মাসে নির্ধারিত ফরম্যাটে জাহাজ হ্যান্ডলিং, মোট আয়সহ বিভিন্ন পরিচালনাগত তথ্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে।

এসব তথ্যের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ টার্মিনালের কার্যক্রম, কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে পারবে বলে জানান আশিক মাহমুদ।

চুক্তির প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর দাবি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে ডিপি ওয়ার্ল্ড সফলভাবে টার্মিনাল পরিচালনা করছে।

আশিক মাহমুদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের গড় টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম প্রায় আড়াই দিন। বিপরীতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক গড় টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম প্রায় ২৪ ঘণ্টা। চট্টগ্রাম বন্দরে ঘণ্টায় গড়ে ২২টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হলেও ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক গড় ৩৫টির বেশি।

চুক্তির পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ না করার বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের মানুষের কাছে জবাবদিহিতার বিকল্প নেই। তবে পূর্ণ চুক্তি প্রকাশ করলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের দর-কষাকষির অবস্থান দুর্বল হতে পারে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও সম্পূর্ণ চুক্তির পরিবর্তে সারাংশ প্রকাশের সুপারিশ করে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আশিক মাহমুদ আরও বলেন, চুক্তিতে স্বচ্ছতা বজায় রাখার পাশাপাশি বেসরকারি অংশীদারের বৈধ গোপনীয়তাও রক্ষা করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

চুক্তিটিকে বাংলাদেশের জন্য বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের কর্মকর্তারা দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা-দর-কষাকষির মাধ্যমে চুক্তিটি চূড়ান্ত করেছেন। তাঁর মতে, দুর্নীতি দমন, দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক যোগাযোগ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে চুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

চুক্তি স্বাক্ষর শেষে সংবাদ সম্মেলনে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, ১৫ বছরের নির্ধারিত মেয়াদে এনসিটির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া হয়েছে। তবে এনসিটির জমি, অবকাঠামো, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে।

মন্ত্রী জানান, চুক্তির শুরুতেই ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি দেবে। এছাড়া প্রথম ১০ বছরে টার্মিনালের আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

চুক্তিতে নির্ধারিত দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে বলে জানান নৌপরিবহনমন্ত্রী।

তিনি আরও জানান, টার্মিনাল পরিচালনার রাজস্বের অংশের পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি নির্ধারিত বার্ষিক ফিও পাবে। প্রতি টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং থেকে পাওয়া আয়ের ৬৭ শতাংশ বন্দর কর্তৃপক্ষকে দেবে ডিপি ওয়ার্ল্ড।

নৌপরিবহনমন্ত্রীর হিসাবে, গড়ে একটি কনটেইনার থেকে ১৪০ থেকে ১৫০ ডলার আয় হলে এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অংশ হবে প্রায় ৯৩ থেকে ১০৩ ডলার।

 

 

ইত্তেফাক/এএম