ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে টিপসই নিয়ে ভুয়া কাবিননামা তৈরির চাঞ্চল্যকর ঘটনায় দুজনকে অভিযুক্ত করে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী আছিয়া খাতুন (৪৫)।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) অভিযোগ দায়েরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন ফুলবাড়ীয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান। এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ৫ সন্তানের জননী ওই নারী লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযুক্তরা হলেন- আব্দুল কুদ্দুস ও আবদুস ছাত্তার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভুক্তভোগী নারী উপজেলার হলেন পুটিজানা ইউনিয়নের পাটুলী গ্রামের মোছাম্মৎ আছিয়া বেগম (৪৩)। এক যুগ আগে তার স্বামীর মৃত্যু হয়। ঘরে পাঁচ সন্তান রয়েছে। তিন ছেলেকে বিয়ে করিয়েছেন। নাতি রয়েছে। ওই নারীর সবার ছোট ছেলের বয়স ১৩ বছর।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে বিয়ের প্রস্তাব এলেও বিয়ে করেনি আছিয়া। প্রায় চার বছর আগে তার মেঝ ছেলে আসাদুলকে বিয়ে করানোর সময় প্রতিবেশী আব্দুল কুদ্দুসকে (৬২) উকিল শ্বশুর দেওয়া হয়। আত্মীয় হওয়ার সুবাদে প্রায়ই বাড়িতে যাওয়া আসা করতেন তিনি। আব্দুল কুদ্দুস একাধিকবার স্থানীয় আবদুস ছাত্তারের মাধ্যমে বিধবা আছিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রতিবারই তিনি প্রস্তাব নাকচ করেছেন।
গত প্রায় দেড় মাস আগে আবদুস ছাত্তার বর্তমান সরকারে ঘোষিত ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার নামে কৌশলে তার দোকানে নিয়ে নিরক্ষর আছিয়া বেগমের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, পাসপোর্ট সাইজের ছবি নেন। কয়েকদিন পর একটি খাতায় দুটি টিপসইও নেন।
সম্প্রতি বিধবা আছিয়া ও আব্দুল কুদ্দুছ দুজনে বিয়ে করেছেন এমন একটি এফিডেভিট ও কাবিননামার কাগজ দেখিয়ে গ্রামে প্রচার করেন আব্দুস ছাত্তার। পরে এই ঘটনায় ভুক্তভোগী মহিলা স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও সভাপতির কাছে অভিযোগ দেন। সোমবার (৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় পাটুলী গ্রামে ওই নারীর বাড়িতে সালিশ হয়। সেখানে আছিয়ার মুখ থেকে বিস্তারিত শোনেন উপস্থিত লোকজন। অভিযুক্ত ছাত্তার উপস্থিত না থাকায় পরবর্তীতে আবারও বুধবার (৭ অক্টোবর) সালিশের তারিখ দেওয়া হয়েছিল।
সালিশে উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হতদরিদ্র আছিয়া বেগমকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে ব্যর্থ হয়ে আব্দুল কুদ্দুস ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কৌশলে এফিডেভিট ও ভুয়া কাবিননামা করেছেন। পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডে কাজী অফিসের সিলযুক্ত একটি কাবিননামা ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেনমোহর ধার্য ও নগদ ৫০ হাজার টাকা আদায় দেখানো হয়েছে। কাবিননামায় আব্দুল মান্নান ও সাইফুল ইসলাম নামে দুজনকে সাক্ষী হিসেবে দেওয়া হয়েছে। অথচ তারা কেউ এ বিষয়টি জানেন না। আব্দুস ছাত্তার টাকার বিনিময়ে এ কাজটি করেছেন। তার সঙ্গে আব্দুল হেকিম মাস্টার জড়িত রয়েছে। সালিসে আবদুস ছাত্তারকে উপস্থিত থাকতে বলা হলেও তিনি আসেনি।
অভিযুক্ত আব্দুস ছাত্তার নিজেকে জামায়াতের সহযোগী সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। তার কসমেটিকসের দোকান আছে। অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ওই নারীর কাছ থেকে ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে তিনি কোনো টিপসই নেননি। এলাকার জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে ফাঁসানো হচ্ছে।
উপজেলা জামায়াতের আমির ফজলুল হক শামীম জানান, ঘটনাটি জানার পর স্থানীয় দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে খোঁজ নিয়েছি। আবদুস ছাত্তার জামায়াতের নিয়মিত পদধারী কোনো নেতা নন। নির্বাচনের সময় তিনি একটি কেন্দ্র কমিটির সহযোগী সদস্য ছিলেন। এর আগে তিনি বিএনপি করতেন বলেও জানান তিনি।
ফজলুল হক আরও বলেন, তবে তিনি (আবদুস ছাত্তার) এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন বলে আমাদের ধারণা। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। আমরা চাই প্রকৃত অপরাধীদের আইন অনুযায়ী বিচার হোক। তবে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে মনে হচ্ছে, ঘটনাটি সাজানো বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে।
এদিকে থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর থেকে আব্দুল কুদ্দুস ও আবদুস ছাত্তার গাঁ ঢাকা দিয়েছেন। এতে থানায় অভিযোগ প্রসঙ্গে তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
তবে এর আগে অভিযোগ অস্বীকার করে আবদুস ছাত্তার বলেছিলেন, ‘ওই নারীর কাছ থেকে ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে তিনি কোনো টিপসই নেননি। এলাকার জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে ফাঁসানো হচ্ছে।’
এই ব্যাপারে ফুলবাড়ীয়া থানার এসআই মিজানুর রহমান বলেন, এই ঘটনায় থানায় একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। আমি পুটিজানা ইউনিয়নের বিট অফিসার হওয়ায় তদন্ত করার জন্য আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তের পর বিস্তারিত জানানো হবে।

ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে বিধবার টিপসই ও এনআইডি নিয়ে বানাল ভুয়া কাবিননামা