এয়ারবাস ক্রয় ও গণি মিয়া সিনড্রোম

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৫

ষাটের দশকে প্রাইমারি স্কুলের পাঠ্যবইয়ে পড়া কৃষক গণি মিয়ার গল্পটি ঐ প্রজন্মের অনেকেরই হয়তো মনে আছে। গণি মিয়া কৃষক হলেও নিজের কোনো জমি ছিল না। অন্যের জমি চাষ করেই তার সংসার চালাতে হতো। কিন্তু কাছিমের যেমন শখ হয় চিৎ হয়ে শোয়ার, গণি মিয়ারও শখ জাগল ছেলের বিয়েতে ধুমধাম করার এবং তিনি তা-ই করলেন। মহাধুমধাম করে ছেলের বিয়ে দিলেন। এজন্য তার অনেক টাকা কর্জ হলো। সেই কর্জ পরিশোধ করতে গিয়ে তার নাভিশ্বাস। একপর্যায়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে গেলেন। গণি মিয়ার যুগ শেষ হয়েছে সেই কবেই! কিন্তু তার অসুখটা ছড়িয়ে গেছে ব্যক্তি থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্রে। বিশ্বপুঁজিবাদের বদৌলতে আজ আমরা সবাই ‘গণি মিয়া সিন্ড্রোমে’ আক্রান্ত।

খবরে প্রকাশ, বাংলাদেশ সম্প্রতি ফ্রান্স থেকে এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। গত ৭ অক্টোবর রাজধানীর র‌্যাডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেনে ‘স্প্রেডিং আওয়ার উইংস টুগেদার’ অনুষ্ঠানে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর আগে গত ৩০ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪টি, পরে সেপ্টেম্বরে আরও ১১টি, মোট ২৫টি বোয়িং কেনার চুক্তি হয়েছে। অর্থাৎ ছয় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এত ত্বরিত গতিতে এমন রাষ্ট্রীয় কেনাকাটার নজির আমাদের আছে বলে আমার জানা নেই। উল্লেখ্য, বর্তমানে আমাদের দেশে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানে যা আছে, ছয় মাসের মধ্যে তার প্রায় দ্বিগুণসংখ্যক নতুন উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

আমাদের বিমানের বহর সত্যিই পুরোনো, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। আধুনিক বিমান ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন, এ যুক্তিও অমূলক নয়। কিন্তু ছয় মাসের মধ্যে তড়িঘড়ি করে ৩৫টি বিমান কেনার প্রয়োজনটা অনেক অনুচ্চারিত প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। অনেকের মতেই বোয়িং কেনা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য-সম্পর্ক ও শুল্ক-আলোচনায় দরকষাকষিরই অংশ। এদিকে ইউরোপের সঙ্গে ভারসাম্য রাখতে এয়ারবাসও লাগে-কূটনীতির ভাষায় যাকে বলে ‘ভারসাম্যের পররাষ্ট্রনীতি’। এই বিমানগুলো কোন রুটে উড়বে, কত যাত্রী বইবে, আর সেই আয়ে ঋণ শোধ হবে কি না, এর কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই নিয়েও কোনো প্রকাশ্য ব্যবসায়িক হিসাব আমরা দেখিনি। যে বিমান সংস্থা বছরের পর বছর লোকসানে চলেছে, তার বহর দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত ব্যবসায়িক হিসাবে হয়েছে, নাকি কূটনৈতিক সৌজন্যে, সেটা জানার অধিকার নিশ্চয়ই দেশের করদাতাদের রয়েছে। কিন্তু দেশের আমজনতাকে অন্ধকারে রেখে পাঁচতারকা হোটেলের রঙিন আলোয় একের পর এক বিমান কেনার চুক্তি করা হচ্ছেÑযাকে স্বাভাবিকভাবে অনভিপ্রেত বলাই চলে।

এয়ারবাস কেনার চুক্তির এক দিন পরই খবর বেরিয়েছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত সচল রাখতে ‘কঠিন শর্তে’ ৩২০ কোটি ডলারের বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হচ্ছে। গত ৭ অক্টোবর সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অনমনীয় ঋণ সম্পর্কিত স্থায়ী (এসসিএনসিএল) কমিটির সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সভায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত এবং নিয়মিত সরবরাহ বজায় রাখতে সৌদি আরবের জেদ্দাভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইটিএফসি) থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩১০ কোটি ডলারের স্বল্পমেয়াদি অনমনীয় ঋণের ভূতাপেক্ষ অনুমোদনও দিয়েছে এসসিএনসিএল।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ২০২৫ সালের ডিসেম্বর বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ৩৫১ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা। এর মধ্যেই এসেছে আরেক খবর। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, বড়সড় একটি অর্থনৈতিক ধাক্কাতেই দারিদ্রসীমার নিচে চলে যেতে পারে দেশের প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ। গত কয়েক দশকে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা এখন উলটো পথে যাচ্ছে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। এই যে গত চার বছরে ৮০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই একেকজন গণি মিয়া, যারা এতদিন কোনোমতে টিকে ছিলেন, এখন একটু ধাক্কাতেই পড়ে গেছেন। এই অবস্থায় রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হওয়ার কথা ছিল কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, খাদ্য-সরবরাহ ও স্বাস্থ্য। তার বদলে আমরা শুনছি বিমান কেনার গল্প।

প্রাচীন ভারতের চার্বাক-দর্শনের নামে প্রচলিত একটি উক্তি আছে: ‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ’, অর্থাৎ ঋণ করে হলেও ঘি খাও। চার্বাক বস্তুবাদী ছিলেন, তার কথায় পরকালের ভয় নেই, আছে এই জীবনের ভোগ। কিন্তু একটি পার্থক্য আছে। চার্বাকের ঋণ-করা ঘি খেতেন ব্যক্তি, নিজের দায়ে, নিজের ঝুঁকিতে। আমাদের বর্তমান ব্যবস্থায় ঘি খায় এক পক্ষ, আর ঋণ শোধ করে অন্য পক্ষ। যারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তারা পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত বা বড়জোর পরবর্তী মেয়াদ পর্যন্ত ভাববেন। কিন্তু ঋণ শোধ করবে আজকের শিশুরা, যাদের এই চুক্তিতে সই করার কেউ ছিল না। এ হলো চার্বাকের দর্শনের চেয়েও সুবিধাজনক সংস্করণ, যেখানে ঘি-পানের আনন্দ এক জনের, আর ঋণের বোঝা আরেক জনের। গণি মিয়া অন্তত নিজের ছেলের বিয়েতে খরচ করেছিল, ভুল হলেও সে ভুলের মাশুল দিয়েছিল নিজেই। আমাদের ‘গণি মিয়া’রা অন্যের ভবিষ্যৎ বন্ধক রেখে উৎসব করছেন। তফাত শুধু এটুকু যে, গণি মিয়ার ঋণের হিসাব অন্তত গ্রামের সবাই জানত; আমাদের জনগণ তা জানে না। প্রসঙ্গত, শ্রীলঙ্কার কথা স্মরণ করা যেতে পারে। ঋণ নিতে নিতে দেশটি এমন অবস্থায় পৌঁছে যায় যে, ২০২২ সালে বিদেশি ঋণ পরিশোধে অক্ষমতা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। একপর্যায়ে জ্বালানি, ওষুধ ও খাবারের অভাবে মানুষ রাস্তায় নামে। শেষে দেশটির প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। সেই সংকটের শিক্ষা একটাই :ঋণ নিজে বিপদ নয়, বিপদ হলো স্বচ্ছতাহীন ঋণ আর আয়হীন ব্যয়। যে ঋণ থেকে আয় আসে, তা বিনিয়োগ; যে ঋণ শুধু শোভা বাড়ায়, তা বোঝা।

গণি মিয়ার গল্পের শেষে ছিল নিঃস্ব হওয়ার করুণ পরিণতি। একটি পরিবার ঋণের ফাঁদে পড়লে ধ্বংস হয়, আর একটি রাষ্ট্র পড়লে তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই বন্ধক হয়ে যায়। ঋণদাতারা তখন শুধু সুদ নেয় না, নীতিও নির্দেশ করে। আকাশে ডানা মেলার স্বপ্ন দেখা দোষের কিছু নয়। কিন্তু যে জাতির লাখ লাখ মানুষের পায়ের নিচের জমিই সরে যাচ্ছে, তার সর্বাগ্রে দরকার মাটি শক্ত করা। নইলে বিমান আসবে, রানওয়েতে সারি দিয়ে দাঁড়াবে, আর নিচে পড়ে থাকবে ঋণের হিসাব, আর একেক জন গণি মিয়া। 

লেখক: সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

ইত্তেফাক/এমএস