ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী

হুথিদের মোকাবিলায় কেন হিমশিম খাচ্ছে সৌদি?

বিশ্লেষকরা বলছেন, হুথিরা প্রথাগত যুদ্ধের পরিবর্তে অত্যন্ত কার্যকর ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ যুদ্ধকৌশল' ব্যবহার করছে । লন্ডনভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান মেনা অ্যানালিটিকার অ্যান্ড্রেয়াস ক্রিগ বলেন, হুথিদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করার প্রয়োজন নেই । মাঝেমধ্যে দু-একটি সফল আঘাতই রিয়াদের মতো কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে আতঙ্ক ছড়াতে যথেষ্ট।

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪৩

ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ও প্রাণঘাতী হামলার মুখে পড়েছে সৌদি আরব। গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলায় ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশটির প্রধান বিমানবন্দরে এটিই সবচেয়ে বড় হামলার ঘটনা। এরপর দাম্মামের কিং ফাহাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টেও হামলা হয়েছে । এ অবস্থায় বর্তমানে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সৌদি আরব ।

চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার পর রিয়াদ সেখানে সামরিক তৎপরতা বাড়ালে এই উত্তেজনার সৃষ্টি হয় । ইয়েমেনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড হুথিদের নিয়ন্ত্রণে, যেখানে দেশটির ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ বাস করেন। গত মাসে লোহিত সাগর উপকূলের বেশ কিছু কৌশলগত এলাকা হুথিরা দখল করে নিলে তাদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব বিমান হামলা চালায় এবং সরকারি বাহিনীর পালটা অভিযানে সমর্থন দেয়। এর জবাবে সৌদি আরবের অত্যন্ত সংবেদনশীল তেল ও পর্যটন অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে শুরু করেছে হুথিরা ।

প্রশ্ন উঠেছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট ও অত্যাধুনিক পশ্চিমা সমরাস্ত্র থাকা সত্ত্বেও কেন হুথিদের ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে সৌদি আরব ? কেন তারা এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারছে না, উলটো কেন তাদের ধরাশায়ী হতে যাচ্ছে? এর সঠিক জবাব না মিললেও বিশ্লেষকরা বলছেন, হুথিরা প্রথাগত যুদ্ধের পরিবর্তে অত্যন্ত কার্যকর ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ যুদ্ধকৌশল' ব্যবহার করছে। ২০২৫-২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, সৌদি আরবের বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৮৩.২ বিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বে অষ্টম সর্বোচ্চ । তাদের বহরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং এফ-১৫ ইগলের মতো অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। এত কিছুর পরও হুথিদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণগুলো মধ্যে রয়েছে :

  • সাশ্রয়ী বনাম বহুমূল্য কৌশলের অসমতা

হুথিরা যে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, সেগুলোর উৎপাদন খরচ অত্যন্ত কম (একটি ড্রোনের খরচ প্রায় ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ ডলার)। কিন্তু এগুলোকে ধ্বংস করতে সৌদিকে যে প্যাট্রিয়ট বা থাড ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে হয়, তার প্রতিটির মূল্য কয়েক মিলিয়ন ডলার। ফলে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে এটি সৌদির জন্য চরম লোকসান ও অস্ত্রের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

  • আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা

হুথিরা একসঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন গতি ও উচ্চতার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ঝাঁকে ঝাঁকে হামলা চালায় । তারা প্রথমে ধীরগতির ‘সুইসাইড ড্রোন' পাঠায় যা রাডারকে বিভ্রান্ত করে এবং পরে ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে মূল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে । তা ছাড়া নিম্ন- উচ্চতা দিয়ে ওড়া ড্রোনগুলো সৌদির উচ্চ-উচ্চতার রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম । সম্প্রতি কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এই কাঠামোগত দুর্বলতাকে আবারও সামনে এনেছে ।

  • আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও ইরানের সহায়তা

হুথিরা কোনো সাধারণ মিলিশিয়া গোষ্ঠী নয়; তারা দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে অভিজ্ঞ এবং ইয়েমেনের পাহাড়ি দুর্গম অঞ্চলে লড়াইয়ে বিশেষভাবে পারদর্শী। এর পাশাপাশি তারা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস এবং হিজবুল্লাহর কাছ থেকে উন্নত ড্রোন, নেভিগেশন ও হাইপারসনিক ক্ষমতার ক্ষেপণাস্ত্রের (যেমন: প্যালেস্টাইন-২) প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সহায়তা পাচ্ছে।

• সৌদি ও হুথিদের সামরিক সক্ষমতা

বিশ্বের সবচেয়ে সুসজ্জিত সামরিক বাহিনীর একটির মালিক সৌদি আরব । ২০২৫ সালে দেশটি তাদের জিডিপির ৬.৫ শতাংশ বা প্রায় ৮৩ বিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষাতে ব্যয় করেছে, যা বিশ্বে অষ্টম সর্বোচ্চ সামরিক বাজেট। সম্প্রতি তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করা সৌদির নিজস্ব সামরিক পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা সীমিত। তাই তারা পশ্চিমা নির্মাতাদের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের উন্নতমানের আধুনিক অস্ত্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল । অন্যদিকে, ২০১৪ সালে সানা দখল করার পর থেকে হুথিরা তাদের অস্ত্রাগার লক্ষণীয়ভাবে উন্নত করেছে। তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ইয়েমেন থেকে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দূরের ইসরাইলে আঘাত হানতে সক্ষম। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে তারা একসঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন গতির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে ।

• কেন উত্তেজনা বাড়াচ্ছে হুথিরা?

লন্ডনভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান মেনা অ্যানালিটিকার অ্যান্ড্রেয়াস ক্রিগ বলেন, হুথিদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করার প্রয়োজন নেই। মাঝেমধ্যে দু-একটি সফল আঘাতই রিয়াদের মতো কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে আতঙ্ক ছড়াতে যথেষ্ট । বিশ্লেষক জুনো জানান, হুথিরা মূলত খেলার নিয়ম নতুন করে লিখতে চায় । সৌদি বিমান বাহিনী সানার বিমানবন্দরে হামলা চালানোয়, তারা এখন সৌদির সঙ্গেও ঠিক একই আচরণ করছে । তিনি বলেন, হুথিদের বার্তা স্পষ্ট, শান্তির মূল্য দিন দিন বাড়ছে। তিনি আরো বলেন, সৌদির জন্য এটি একটি চরম বিপর্যয়, কারণ তারা বেশ কয়েক বছর ধরে ইয়েমেন যুদ্ধ থেকে নিজেদের বের করে আনার চেষ্টা করছিল ।

  • • রিয়াদ বিমানবন্দর কেন বড় দুশ্চিন্তা ?

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের 'ভিশন ২০৩০'-এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রিয়াদ। শহরটিকে পর্যটন, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক ইভেন্টের বড় হাব হিসেবে গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য । কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিমানবন্দরটি অত্যন্ত সংবেদনশীল । ক্রিগ সতর্ক করে বলেছেন, বিমানবন্দরে এই হামলায় সামরিক ক্ষতি কম হলেও এর অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। রিয়াদে শুরু হতে যাওয়া 'ডব্লিউপিসি এনার্জি কংগ্রেস'-এর মতো হাই-প্রোফাইল ইভেন্টের ঠিক আগেই শনিবারের এই প্রাণঘাতী হামলাটি ঘটল। পূর্বে হামলার আগে কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের ফোনে সতর্কবার্তা পাঠালেও সম্প্রতি তা বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরো বেড়েছে । এদিনের হামলার পর সৌদি সরকারের কোনো প্রথমিক বিবৃতি আসার আগেই বেশ কয়েকটি দেশের দূতাবাস নিজেদের নাগরিকদের রিয়াদ বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়, যা কূটনৈতিক অস্বস্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে ।

ইত্তেফাক/এনএন