এ বছর ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির হিসাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি। মঙ্গলবার প্রকাশিত আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক (ডব্লিউইও) প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির এই চিত্র উঠে এসেছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ—যা বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) দেওয়া পূর্বাভাসের চেয়েও কম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে সর্বশেষ এত দুর্বল প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে। ঐ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল মাত্র ৩ দশমিক ১১ শতাংশ। এমনকি কোভিড মহামারির সময়ও সাড়ে ৩ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছিল।
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফের পূর্বাভাস অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার তুলনায়ও কম। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এডিবি পূর্বাভাস দিয়েছে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির। তবে সরকার চলতি অর্থবছর বাজেটে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করছে।
এই অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের চেয়েও উদ্বেগ বাড়ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ে। গত এপ্রিলে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছিল আইএমএফ। নতুন পূর্বাভাসে তা বাড়িয়ে ১০.৯ শতাংশ করা হয়েছে। প্রবৃদ্ধি কমার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বমুখী পূর্বাভাস দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এদিকে, একই অর্থবছরে ভারতের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ ও ভুটানের ৬.৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। ব্যাংককে চলমান আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠকের মধ্যে সংস্থাটির নতুন পূর্বাভাস প্রকাশিত হলো। এই বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সংস্কার কর্মসূচি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থায়ন পাওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
আইএমএফের পূর্বাভাসের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, দেশের অর্থনীতি যে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে, সেটি পূর্বাভাসে উঠে এসেছে। তবে এই অবস্থা পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। গত সপ্তাহে বিশ্বব্যাংক তাদের পূর্বাভাস দিয়েছে, সেখানেও উঠে এসেছে বাংলাদেশ গত কয়েক বছর ধরেই দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। এর কিছু কারণ আন্তর্জাতিক, যেমন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের বাজারে প্রভাব রয়েছে। তবে এই পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশকেও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর পরও প্রতিবেশী দেশ ভারত, ভিয়েতনামসহ অনেক দেশের ভালো প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। তাছাড়া এসব দেশের মূল্যস্ফীতি কমে আসবে বলেও পূর্বাভাসে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের এই দুর্বল অবস্থার দায় পুরোপুরি বৈশ্বিক কারণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না মন্তব্য করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, রাজস্ব আদায় কম, ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা, বিনিয়োগের বাধাগুলো দুর করার জন্য যেরকম প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করা প্রয়োজন ছিল, সেগুলো সেভাবে এগোয়নি। আইএমএফের সংস্কার কর্মসূচিতেও এগুলো ছিল। সরকার আইএমএফের কর্মসূচিতে থেকে বেরিয়ে নতুন কর্মসূচিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে আইএমএফের কর্মসূচি থাকুক বা না থাকুক দেশের অর্থনীতির জন্য সংস্কার জরুরি। কারণ সংস্কারের মাধ্যমে ব্যাংকি খাতে আস্থা বাড়ানো, রাজস্ব আদায়ে গতি বাড়ানো, মান সম্মত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তাবায়ন ছাড়াও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
