বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংবিধানের ব্যাখ্যা প্রদানের ক্ষেত্রে এবং মৌলিক কাঠামোসংক্রান্ত বিষয়ে রাষ্ট্রের অন্যতম এই অঙ্গের এখতিয়ার কী হবে—তা সাংবিধানিকভাবে সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন। এমন মতামত দিয়েছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষকরা। গতকাল মঙ্গলবার সংসদ ভবনে কেবিনেট কক্ষে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সঙ্গে মতবিনিময়ে তারা এই মত দেন।
বৈঠক শেষে সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ উপাচার্য-শিক্ষকদের ওপরিউক্ত মতামতের কথা জানিয়ে বলেন, ‘রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ, যাতে অন্য অঙ্গের ওপর খবরদারি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বজায় রেখে এর এক্তিয়ারও স্পষ্ট করা প্রয়োজন, যাতে সংবিধানের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে জনপ্রত্যাশা উপেক্ষিত না হয়।’
বিশেষ কমিটির এই ৭ম বৈঠকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অবদান রাখা শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা অংশ নেন। তারা সংবিধান সংশোধন, জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ এবং সংবিধানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ সংশোধন বিষয়ে নিজেদের মতামত ও প্রস্তাব তুলে ধরেন। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির কিছু বিষয় মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও দিয়েছেন কেউ কেউ।
আলোচনায় সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে কার্যকর পদ্ধতি নির্ধারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও এক্তিয়ার, জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। পাশাপাশি বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংসদের উচ্চকক্ষ প্রবর্তন এবং সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিত্বের পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষকরা সংবিধানের বিভিন্ন অংশে কী কী বিষয় প্রতিফলিত হওয়া দরকার, তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, অথচ জাতির দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন—এমন বিষয় নিয়েও তারা মতামত দিয়েছেন। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের বর্তমান বিধান, ভবিষ্যতে সংশোধনের প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় নমনীয়তা ও স্থিতিশীলতার ভারসাম্য এবং দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাইরে বিকল্প কোনো পদ্ধতি রাখা যায় কিনা, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ এবং পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিলুপ্ত সংবিধানের মৌলিক কাঠামোসংক্রান্ত বিধান নিয়েও মতামত এসেছে।
নির্বচানকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও এর গঠনপ্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা হয়েছে জানিয়ে কমিটির সভাপতি বলেন, এ বিষয়ে অনেকে লিখিত মতামত দেবেন বলে জানিয়েছেন। তবে, বৈঠকে এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়নি। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিকল্পগুলোর মধ্যে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বাদ দেওয়ার বিষয়ে জুলাই সনদ প্রণয়নের সময় ঐকমত্য হয়েছিল। আগের বিকল্পগুলোতে ঐকমত্য না হলে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে বিচার বিভাগের ভূমিকা রাখার বিষয়ে আলোচকদের মতামত পাওয়া গেছে।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। উচ্চকক্ষে কোন কোন শ্রেণি-পেশার বা এলাকার প্রতিনিধিত্ব থাকবে, প্রতিনিধিরা কীভাবে নির্বাচিত হবেন, জেলাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব থাকবে কিনা এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা রাখা যায় কিনা; এসব বিষয়ে মতামত দিয়েছেন শিক্ষাবিদেরা। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির কিছু বিষয় রাষ্ট্রের সামর্থ্য অনুযায়ী মৌলিক অধিকারে অন্তর্ভুক্ত করা যায় কিনা, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সংবিধানের ৭ম অনুচ্ছেদে জনগণের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি আরো স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রস্তাবও এসেছে।
সংবিধান সংশোধনের চলমান প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ না থাকার বিষয়ে বিশেষ কমিটির সভাপতি বলেন, ‘আমরা তো জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্যই কাজ করছি। বিরোধী দলের নেতাদের কমিটিতে নাম দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছি। তারা এখনো নাম দেননি। যখনই দেবেন, তাদের স্বাগত জানানো হবে।’ তিনি বলেন, ‘সরকার ও বিরোধী দলসহ সবাই মিলে সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করতে চায়। এ ব্যাপারে আমাদের আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই। আমরা চাই, তারা আলোচনায় আসুক। তবে, বিরোধী দল না এলেও সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। এটা জাতির প্রত্যাশা, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা আমাদের অঙ্গীকার।’
বিরোধী দল লিখিত মতামত দিতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কমিটির প্রতিবেদন প্রণয়নের পর সংবিধান সংশোধনের বিল সংসদে উত্থাপিত হলে বিরোধী দল তাতে অংশ নেবে বলে আমরা আশা করছি। তারা যদি তাদের ভূমিকাটা সঠিকভাবে পালন না করে, সেটা জাতি দেখবে।’
কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশেষ কমিটির গতকালের বৈঠকে কমিটির সদস্য—সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নূরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন এবং মাহমুদুল হক রুবেল অংশ নেন। বৈঠকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্যাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, অধ্যাপক গীতিআরা নাসরিন, অধ্যাপক সামিনা লুত্ফা, অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কে এইচ লুত্ফুল এলাহী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক একরামুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম ও অধ্যাপক শামীমা সুলতানা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মো. মাহবুবুর রহমান, অধ্যাপক মোহাম্মদ একরামুল হক এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক নেসার ইউ আহমেদ প্রমুখ।
