পথশিশুদের শিক্ষা দিয়ে শুরু, ১৪ বছরে মাস্তুলের মানবিক কার্যক্রম বিস্তৃত দেশে-বিদেশে

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:০৪

পথশিশুদের পড়ানোর উদ্যোগ দিয়ে ২০১২ সালে যাত্রা শুরু করা মাস্তুল ফাউন্ডেশন ১৪ বছর পূর্ণ করে ১৫ বছরে পদার্পণ করেছে। প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক কাজী রিয়াজ রহমানের নেতৃত্বে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বর্তমানে শিক্ষা, খাদ্য, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, আশ্রয়, দুর্যোগ মোকাবিলা ও আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে।

মাস্তুল ফাউন্ডেশন এনজিও বিষয়ক ব্যুরোতে নিবন্ধিত একটি অলাভজনক, অরাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবী মানবিক সংস্থা। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও জয়েন্ট স্টক কোম্পানির অনুমোদনের আওতায় বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। মানবিক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে স্বাবলম্বী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নিজের টিউশনির অর্থ সঞ্চয় করে পথশিশুদের পড়ানোর মাধ্যমে কাজী রিয়াজ রহমানের উদ্যোগের শুরু। পরে কয়েকজন তরুণকে সঙ্গে নিয়ে সেই উদ্যোগই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নানা ধরনের সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে মাস্তুল।

প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম কার্যক্রম হলো যাকাত ও সদকার অর্থের মাধ্যমে দরিদ্র ও কর্মক্ষম মানুষকে স্বাবলম্বী করা। ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য বিভিন্ন আয়মূলক উপকরণ দেওয়ার পাশাপাশি বেকার ও কর্মক্ষম যুবকদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতেও কাজ করছে তারা। মাস্তুলের লক্ষ্য, সহায়তা পাওয়া একজন মানুষ ভবিষ্যতে নিজের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি অন্যের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করবেন।
খাদ্য সহায়তার ক্ষেত্রে ‘মেহমানখানা’ উদ্যোগের মাধ্যমে রাজধানীর ১৫টি এলাকায় প্রতিদিন অসহায়, পথচারী, শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বিনামূল্যে রান্না করা খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি সহায়তা গ্রহণকারীদের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষা ও আশ্রয় কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ঢাকার হাজারীবাগের বারইখালি এলাকায় মাস্তুলের মাদ্রাসা, এতিমখানা ও শেল্টার হোম রয়েছে। সেখানে সুবিধাবঞ্চিত ও এতিম শিশুদের শিক্ষা, খাবার, স্বাস্থ্যসেবা এবং নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
আশ্রয়হীন ও নিঃসঙ্গ প্রবীণদের জন্য ১০ তলা বিশিষ্ট ‘ইসলামিক শেল্টারহোম কমপ্লেক্স’ নির্মাণের উদ্যোগও নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, এতিমখানা ও বৃদ্ধাশ্রম রাখার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে মাস্তুল।

দুর্যোগ ও জরুরি পরিস্থিতিতেও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। করোনা মহামারির সময় বেওয়ারিশ ও পরিচয়হীন মরদেহ দাফনের পাশাপাশি ২০২২, ২০২৪ ও ২০২৬ সালের বন্যায় ত্রাণ, খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের আওতায় বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের কার্যক্রমও পরিচালনা করছে সংস্থাটি। পাশাপাশি ঢাকা মেডিকেল কলেজে সরকারি অনুমোদনের মাধ্যমে মরদেহ গোসলখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

দেশের বাইরে তুরস্কের ভূমিকম্পের পর সহায়তার পাশাপাশি ফিলিস্তিনের গাজা, সুদান ও নেপালের মানবিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানিয়েছে মাস্তুল। ২০২৪ সাল থেকে গাজায় যুদ্ধ, অবরোধ ও খাদ্য-চিকিৎসা সংকটে থাকা শিশু, আহত ব্যক্তি ও সাধারণ পরিবারের জন্য খাবার ও ওষুধসহ মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
মাস্তুল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক কাজী রিয়াজ রহমান বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি কাজের মূল উদ্দেশ্য মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আমরা বিশ্বাস করি, একজন মানুষকে সাময়িকভাবে সাহায্য করার পাশাপাশি তাকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি বলেন, ‘মাস্তুলের পথচলায় দেশের মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতা সবচেয়ে বড় শক্তি। আমরা চাই মানুষের যাকাত, সদকা ও দান যথাযথভাবে ব্যবহার করে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে, যেখানে সহায়তা শুধু একটি মুহূর্তের প্রয়োজন মেটাবে না, বরং একজন মানুষের জীবন পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করবে।’

১৪ বছর পূর্তিতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত ও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক কাজী রিয়াজ রহমানের পাশাপাশি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক সিনিয়র সচিব এম এ আকমল হোসেন আজাদ। ডিরেক্টর হিসেবে যুক্ত হয়েছেন মেজর জেনারেল (অব.) কাজী ইফতেখার-উল-আলম। জনসংযোগ ও যোগাযোগ কার্যক্রমের দায়িত্বে চিফ পাবলিক রিলেশনস অফিসার হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মতিউর রহমান।

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, মানবিক কার্যক্রমকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে নিয়মিত অডিট ও আর্থিক স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যাকাত ও সদকা কার্যক্রম শরিয়াহ বোর্ডের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে বলেও জানিয়েছে তারা।
মাস্তুলের কার্যক্রম শুধু ত্রাণ বিতরণে সীমাবদ্ধ নয় বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। শিশুদের শিক্ষা ও নিরাপদ শৈশব, দরিদ্র পরিবারের আয়, প্রবীণদের আশ্রয়, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের খাদ্য ও ওষুধের ব্যবস্থাকেও মানবিক সেবার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে সংস্থাটি।

পথশিশুদের পড়ানোর ছোট উদ্যোগ থেকে ১৪ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যক্রম বিস্তারের পর বাংলাদেশে মানবিক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিপন্ন মানুষের পাশে থাকার লক্ষ্য নিয়েছে মাস্তুল ফাউন্ডেশন।

প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম, দাতব্য উদ্যোগ, আর্থিক স্বচ্ছতা ও অডিট রিপোর্টসহ বিস্তারিত তথ্য তাদের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি