রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং জোরপূর্বক না করে নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিতের মাধ্যমে টেকসই ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার ও বিকল্প অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) কক্সবাজারের উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে পর্যালোচনা বৈঠক শেষে এসব কথা জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জাহরাত আদিব চৌধুরী।
কমিটির সভাপতি জাহরাত আদিব চৌধুরীর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি সংসদীয় প্রতিনিধিদল বৃহস্পতিবার সকালে উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে। প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য এস কে আজিজুল বারী, সৈয়দ সাঈদ আল নোমান, সানজিদা ইসলাম তুলি এবং মীর আহমদ বিন কাসেম।
পরিদর্শনকালে তারা ছয় নম্বর আশ্রয়শিবিরের 'আরাকান ও মিয়ানমারের ঐতিহ্য কেন্দ্র', নয় নম্বর আশ্রয়শিবিরের 'তুর্কি ফিল্ড হাসপাতাল' এবং চার নম্বর আশ্রয়শিবিরে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডাব্লিউএফপি) খাদ্য বিতরণকেন্দ্র ঘুরে দেখেন। পরে ক্যাম্প ইনচার্জের কার্যালয়ে রোহিঙ্গা তরুণ, নারী ও কমিউনিটি নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা।
মতবিনিময় সভায় ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার সভাপতি সৈয়দ উল্লাহ ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কামাল হোসেনসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ অনির্দিষ্টকাল শরণার্থীশিবিরে অবরুদ্ধ থাকার অনাকাঙ্ক্ষিত জীবন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা শিশুদের শিক্ষা, যুবকদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ, অনলাইনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক মহলের ওপর চাপ বাড়ানোর জোর দাবি জানান।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উপস্থাপিত ৫ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন
সংসদীয় কমিটির সভাপতি জাহরাত আদিব চৌধুরী জানান, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যে পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছেন, তা দ্রুত বাস্তবায়নে কাজ করবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এই লক্ষ্য অর্জনে সংসদীয় কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থান আরও জোরালোভাবে উপস্থাপনের জন্য বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
কমে আসছে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন: জাকাৎ ও বিকল্প অর্থায়নের জোর তাগিদ
সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে আন্তর্জাতিক অর্থায়নে ঘাটতিকে একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেন জাহরাত আদিব চৌধুরী। বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন ও বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকার পরিবর্তনের কারণে মানবিক সহায়তা হ্রাস পাচ্ছে, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রচলিত বৈশ্বিক অনুদানের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর জাকাৎ তহবিলকে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় কাজে লাগানোর সুপারিশ পুনর্ব্যক্ত করা হয়। মালয়েশিয়ার মতো বন্ধুভাবাপন্ন মুসলিম দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও আন্তর্জাতিক সংসদীয় কূটনীতি জোরদারের ওপর তাগিদ দেন তিনি।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংকট ও যৌথ মূল্যায়ন সভা
রোহিঙ্গা সংকটের কারণে স্থানীয় এলাকার পানি, স্যানিটেশন, পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর যে তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে, সেটির সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
বিকেলে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে সরকারি কর্মকর্তা, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি এবং এনজিও প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যগণ। বৈঠকে ক্যাম্পের সার্বিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অর্থায়ন ও প্রত্যাবাসনের অগ্রগতির তথ্য সমন্বয় করে একটি পূর্ণাঙ্গ সুপারিশমালা সংসদে জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
