দেশের প্রায় ৪০ হাজার বেসরকারি এমপিওভুক্ত নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য ৭৮৭ দিন ধরে নেই নির্বাচিত ম্যানেজিং (ব্যবস্থাপনা) কমিটি ও গভর্নিং বডি। দফায় দফায় অ্যাডহক কমিটি গঠন করে পরিচালনা করা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। নিয়মিত পরিচালনা পর্ষদ না থাকায় প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থমকে আছে। কারণ বাধ্যবাধকতা থাকায় তারা আর্থিক, নিয়োগসহ সব কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছেন না। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর নির্বাচিত কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
রাজধানীসহ সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচনের প্রস্তুতিও চলছিল জোরেশোরে। এদিকে নতুন প্রবিধানমালা চূড়ান্ত না হওয়ার কারণ দেখিয়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটি গঠন কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে ঝুলে গেল ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির নির্বাচন। এ নিয়ে অসন্তোষ বিরাজ করছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলেন, অনির্দিষ্টকালের জন্য নির্বাচন স্থগিত রাখার নেপথ্যে কি অ্যাডহক কমিটিকে আগামী শিক্ষাবর্ষের ভর্তি বাণিজ্যের সুযোগ করে দেওয়া? এদিকে সব স্কুল কলেজের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন বন্ধ করাকে গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছে অভিভাবক ঐক্য ফোরাম। সংগঠনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু ও সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম মিয়া গতকাল যৌথ এক বিবৃতিতে সারাদেশের স্কুল কলেজের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন বন্ধ করে আন্তঃ শিক্ষা বোর্ডসমূহের সমন্বয় কমিটির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করায় গভীর উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা প্রকাশ করে বলেন, গভীর ষড়যন্ত্রের আভাস, কিছু দিন যাবত শোনা যাচ্ছিল এক শ্রেণির আমলারা স্কুল-কলেজের নির্বাচন করতে দিবে না। সেটাই এ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সত্যি প্রমাণিত হলো। আমলাতান্ত্রিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শিক্ষা বোর্ডগুলোর কাঁধে বন্দুক রেখে ঠুনকো অজুহাতে সারা দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়া হলো। এর বিরুদ্ধে অভিভাবকরা আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। চলমান নির্বাচনি প্রবিধানমালার আলোকে নির্বাচন করার দাবি জানিয়ে নেতৃদ্বয় বলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচন আয়োজনে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। সংশোধনের দোহাই দিয়ে নির্বাচন বন্ধ করা যাবে না। নেতৃদ্বয় বলেন, গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে কোনোমতেই বেসরকারি স্কুল কলেজের প্রশাসন তথাকথিত আমলাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। নির্বাচনের মাধ্যমে অভিভাবক ও শিক্ষক প্রতিনিধির মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে।
বোর্ডের বিজ্ঞপ্তিতে যা আছে :আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামানের সই করা এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি গঠনসংক্রান্ত প্রবিধানমালা, ২০২৬’ চূড়ান্ত হয়নি। এ কারণে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কমিটি গঠন কার্যক্রম স্থগিত রাখতে অনুরোধ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তির অনুলিপি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক, সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি), জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং বেসরকারি নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষকদের পাঠানো হয়েছে। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির একজন কর্মকর্তা গতকাল ইত্তেফাককে জানান, নিয়মিত কমিটি গঠন পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত স্টপ থাকবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ প্রবিধানমালা তৈরিতে একটু সময় লাগছে। আশা করি শিগিগরই আমরা চূড়ান্তের খবর পাব। এ কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে অ্যাডহক কমিটি গঠন কার্যক্রমে আগের নির্দেশনা বহাল থাকবে।
খসড়া প্রবিধানমালায় যা আছে :জানা গেছে, দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি গঠনের নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সভাপতি নির্বাচনের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এজন্য বিদ্যমান প্রবিধানমালায় সংশোধনী এনে নতুন খসড়া তৈরি করা হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রবিধানমালায় ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক, জনপ্রতিনিধি এবং কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের সভাপতি হওয়ার সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সভাপতির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি বহাল রাখা হয়েছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক। সভায় খসড়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রস্তাবিত প্রবিধানমালা অনুযায়ী, ম্যানেজিং কমিটির বিভিন্ন শ্রেণির সদস্য পদে আগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সদস্য নির্বাচন শেষ হওয়ার সাত দিনের মধ্যে সভাপতি নির্বাচনের জন্য সভা আহ্বান করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ঐ সভায় সভাপতিত্ব করবেন। উপস্থিত নির্বাচিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সভাপতি নির্বাচিত হবেন। তবে সভাপতি নির্বাচনের সভায় ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচিত সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সভাপতির ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক পাশ :একাধিক প্রার্থী সমান সর্বোচ্চ ভোট পেলে তাদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়া, পদত্যাগ, মৃত্যু বা অন্য কোনো কারণে সভাপতির পদ শূন্য হলে সর্বোচ্চ সাত কার্যদিবসের মধ্যে নতুন সভাপতি নির্বাচনের বিধান রাখা হয়েছে। ২০২৫ সালের সংশোধিত প্রবিধানমালায় সভাপতির জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি বহাল রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন প্রবিধানেও কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ন্যূনতম স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক বা কর্মচারী ঐ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে পারবেন না। একই ব্যক্তি একই ধরনের সর্বোচ্চ দুটি এবং মেয়াদভিত্তিক ধরনের সর্বোচ্চ তিনটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে পারবেন—এমন বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে। গভর্নিং বডির সভাপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৪ সালের প্রবিধানে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অবসরপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ ও খ্যাতিমান সমাজসেবকদের মধ্য থেকে তিন জনের নাম প্রস্তাবের বিধান ছিল।
কাউকে চাকরিচ্যুত বা নিয়োগ দেওয়ার এক্তিয়ার নেই অ্যাডহক কমিটির :দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করা হয় গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে। এর মধ্যে কলেজ পর্যায়ের (উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত) পরিচালনা কমিটিকে বলা হয় গভর্নিং বডি। আর মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার কমিটিকে বলা হয় ম্যানেজিং কমিটি। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড এ কমিটি অনুমোদন দেয়। অন্যদিকে, স্নাতক পর্যায়ের কলেজগুলোর গভর্নিং বডির অনুমোদন দেয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। কোনো কারণে নিয়মিত কমিটি করা না গেলে অথবা কমিটি বাতিল বা ভেঙে দেওয়া হলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের জন্য অ্যাডহক কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। এ কমিটির সভাপতি হন সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের মনোনীত ব্যক্তি। কমিটিতে সদস্য হিসেবে থাকেন একজন শিক্ষক ও একজন অভিভাবক। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অ্যাডহক কমিটি গঠন সংক্রান্ত সর্বশেষ বিধিমালায় বলা হয়েছে, ‘অ্যাডহক কমিটি কোনোক্রমেই অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সুপারিনটেনডেন্ট, সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট, গ্রন্থাগারিক, সহকারী গ্রন্থাগারিক বা কোনো কর্মচারী বাছাই এবং নিয়োগ করিতে পারিবে না; আরো শর্ত থাকে যে, কোনো শিক্ষক বা কর্মচারীর ওপর দণ্ড আরোপের প্রয়োজন হলে, শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি গ্রহণপূর্বক দণ্ড আরোপ করিতে পারিবে।’ বিধি অনুযায়ী, কাউকে চাকরিচ্যুত করা বা নিয়োগ দেওয়ার এক্তিয়ার নেই অ্যাডহক কমিটির। দেশে মাধ্যমিক থেকে কলেজ পর্যন্ত প্রায় ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় বেসরকারিভাবে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বেসরকারি মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ৫ লক্ষাধিক এবং ১ কোটি ৬৫ লাখ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের পতনের পর ২০ আগস্ট দেশের সব বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিদের অপসারণ করা হয়। ঐদিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির প্রবিধান ২০২৪-এর ৬৮ অনুযায়ী সভাপতি পদে থাকা সবাইকে অপসারণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও, জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক এবং বিভাগীয় পর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনাররা তার প্রতিনিধির মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করবেন। এর তিন মাস পর ২০ নভেম্বরে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অ্যাডহক কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু হাতেগোনা কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।
