যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে সামরিক দিক থেকেও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ইউক্রেন। দেশটির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত শেষ হয়ে গেছে। এতে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছেন পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র। তিনি জানান, প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতির কারণে সাম্প্রতিক রুশ হামলায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশিরভাগ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে।
এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকার সময়। রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলা বন্ধ করতে কিয়েভের ওপর চাপ দিচ্ছে ওয়াশিংটন। বিপরীতে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে রাশিয়ার হামলাও অব্যাহত রয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতিতে বাড়ছে ঝুঁকি
ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা প্যাট্রিয়ট। রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম অল্প কয়েকটি ব্যবস্থার মধ্যে এটি অন্যতম। তবে প্যাট্রিয়টের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের দাম বেশি হওয়ায় এবং বিশ্ববাজারে সরবরাহ সীমিত থাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী মজুত গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এর সঙ্গে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিভিন্ন দেশ নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। ফলে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের চাহিদা আরও বেড়েছে।
সিএনএনের সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত রাশিয়ার হামলায় কিয়েভের তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খারকিভের জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় কিয়েভে চারজন নিহত এবং ২৫ জন আহত হন।
এর আগে ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছিল, হামলার সময় রাশিয়ার চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক হামলায় প্যাট্রিয়টের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ব্যবহারের পর ইউক্রেনের হাতে থাকা শেষ মজুতও শেষ হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বারবার ক্ষেপণাস্ত্র চেয়েছেন জেলেনস্কি
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের স্বল্পতা নিয়ে কয়েক মাস ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন জেলেনস্কি। গত আগস্টে সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, প্রয়োজনের তুলনায় ইউক্রেনের হাতে তখন মাত্র ১০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। ঘাটতি পূরণে মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতে হচ্ছে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
পরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির লাইসেন্স পাওয়ার আশা প্রকাশ করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। তবে ট্রাম্প এতে সম্মতি না দেওয়ায় উদ্যোগটি আর এগোয়নি।
বুধবার দেওয়া এক বিবৃতিতে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র চেয়েছেন জেলেনস্কি। তার মতে, শক্তি প্রয়োগ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং আগ্রাসী পক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

জ্বালানি স্থাপনায় হামলা নিয়ে বিরোধ
রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলা বন্ধ করতে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপকে কেন্দ্র করেই দুই দেশের মধ্যে বিরোধ আরও জোরালো হয়েছে। জেলেনস্কির যুক্তি, রাশিয়া যদি ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে যায়, তাহলে ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণ বন্ধ করার দাবি ন্যায্য হতে পারে না।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করতে হলে ইউক্রেনকে অন্তত আরও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করতে হবে।
এদিকে ইউক্রেনের জন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর অস্ত্র কেনার ব্যবস্থা এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ করে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও সতর্ক করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছেন ইউরোপের দুই কর্মকর্তা। তবে ইউক্রেনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।
স্টারশিল্ডের সীমাবদ্ধতায় ব্যাহত সামরিক অভিযান
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের সংকটের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা স্টারশিল্ড নিয়েও সমস্যায় পড়েছে ইউক্রেন। ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স পরিচালিত স্টারলিংকের সামরিক সংস্করণ এই ব্যবস্থার গতি ও ব্যবহার সীমিত করায় ইউক্রেনের সামরিক অভিযান, রসদ পরিবহন এবং ড্রোন প্রতিহত করার কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা।
বৃহস্পতিবার স্টারশিল্ডের কার্যক্রম আংশিকভাবে স্বাভাবিক হলেও সব সমস্যা মেটেনি বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের কর্মকর্তারা। স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন স্টারশিল্ডের ব্যবহার বা গতি সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মার্কিন সামরিক বাহিনী ও প্রেসিডেন্টের রয়েছে।
সিএনএনকে ইউক্রেনের এক সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্টারলিংকের কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ায় বুধবার তাদের ইউনিটের কিছু আক্রমণকারী ড্রোন নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারেনি।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে রাশিয়া ইউক্রেনের দিকে ৮৫০টির বেশি আক্রমণকারী ড্রোন পাঠিয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলেনস্কি। তার অভিযোগ, ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার কার্যকারিতা কৃত্রিমভাবে সীমিত করা হচ্ছে।
ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যাওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং সামরিক যোগাযোগব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সূত্র: সিএনএন
