‘পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে’—প্রবাদটি উল্লেখ করে ক্ষমতার দম্ভ নিয়ে সতর্ক করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে ফিরে গেলে বিএনপিকেও জবাবদিহি করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন তিনি। পোস্টে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতি, রাষ্ট্র সংস্কার এবং বিএনপির ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তোলেন নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, হাসিনার মতো কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে বিএনপির অনেক পাপের হিসাব আমরা তুলিনি। ভেবেছিলাম, আগে স্বৈরাচারের পতন হোক, তারপর রাষ্ট্র ও রাজনীতির সব অন্যায়ের হিসাব হবে। কিন্তু ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পরও যদি পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিই ফিরে আসে, তাহলে এত রক্ত, এত আত্মত্যাগ, এত মানুষের স্বপ্নের মূল্য কোথায়?
তিনি বলেন, কর্নেল তাহেরের রক্তের প্রশ্ন আমরা তুলিনি, ১/১১-এর পেছনে রাজনৈতিক ব্যর্থতার হিসাব চাইনি, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা কেন পূরণ হলো না, সেই প্রশ্নও সামনে আনিনি। কারণ আমরা চেয়েছিলাম, বাংলাদেশ শুধু একজন শাসককে বিদায় করবে না, বাংলাদেশ তার স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোকেও বিদায় করবে।
পোস্টে বিএনপি সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লেখেন, ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান কোনো দলের ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার ঐতিহাসিক দাবি। সংবিধানে ক্ষমতার ভারসাম্য, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিষ্ঠান, এসবই ছিল সংস্কারের মূল প্রশ্ন। রাষ্ট্র সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, সেই সংস্কার বাস্তবায়নে ক্ষমতাসীনদের ভূমিকা কী? সংস্কারের প্রতিশ্রুতি কি বাস্তবে রূপ নেবে, নাকি ক্ষমতার হিসাবের কাছে আবারও পরাজিত হবে?
বিএনপির অবস্থান সম্পর্কে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, দলটির নিজস্ব বক্তব্য ও যুক্তি থাকতে পারে। তবে জনগণ জানতে চায়, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে কি না, নাকি ক্ষমতার হিসাব-নিকাশের কাছে তা আবারও উপেক্ষিত হবে।
সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড কিংবা এ ধরনের উদ্যোগের বিরোধিতা তার বক্তব্যের উদ্দেশ্য নয়। তবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জবাবদিহিমূলক না হলে, বিচারব্যবস্থা স্বাধীন না থাকলে, নির্বাচনব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা প্রতিষ্ঠিত না হলে এবং প্রশাসন দলীয় প্রভাবমুক্ত না হলে এসব কর্মসূচি দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা যাবে না।
সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মানুষের রুটিরুজি ক্ষতিগ্রস্ত হলে নীরব থাকার নৈতিক ভিত্তি থাকে না। যে পরিবর্তনের আশায় মানুষ জীবন দিয়েছে, সেই পরিবর্তনকে কোনো দলের স্বার্থে বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়।
নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর মতে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ভেঙে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। সেই সুযোগ কাজে লাগানো না গেলে অতীতের স্বৈরাচারী শাসকের পাশাপাশি বর্তমান ক্ষমতাসীনদেরও দায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, বিএনপির অতীত কর্মকাণ্ডের যেমন জবাবদিহি প্রয়োজন, তেমনি ক্ষমতায় থেকে দলটি বর্তমানে কী করছে, তারও হিসাব দিতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দল জনগণের আত্মত্যাগের মালিক নয়, একইভাবে রাষ্ট্রের মালিকও কোনো দল নয়। রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ।
পোস্টের শেষাংশে তিনি লেখেন, ‘পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে, ক্ষমতার দম্ভ মানুষকে এই সত্য ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু ইতিহাস বারবার মনে করিয়ে দেয়, জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী হয় না।’
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের সংস্কার ছিল জনগণের প্রত্যাশার সীমারেখা। সেই সীমারেখা অতিক্রম করে পুরোনো রাজনীতিতে ফিরে গেলে জনগণ আবারও প্রশ্ন তুলবে। কারণ, পাপের দায় ক্ষমতার আড়ালে ঢাকা যায়, কিন্তু চিরদিনের জন্য মুছে ফেলা যায় না।
