মাত্র ৯ দিন আগে জন্ম তার। জন্মের পঞ্চম দিন থেকে শুরু হয়েছে জ্বর। গতকাল নবজাতককে হাসপাতালে আনা হলে পরীক্ষানিরীক্ষায় জানা যায় নবজাতক রায়ান ডেঙ্গুতে আক্রান্ত; রক্তেও দেখা দিয়েছে ইনফেকশন। চলছে স্যালাইন, ছোট্ট একটা কাচের বক্সের ভেতরে রেখে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে। শিশু রায়ানের মায়ের হাতে এখনো ক্যানোলা লাগানো আছে।
মা লিমা আক্তার বলেন, ঢাকা মেডিক্যালে সিজারের মাধ্যমে রায়ানের জন্ম। সেখান থেকে বাসায় ফিরেই জ্বর শুরু হয়।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর শ্যামলী শিশু হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ৫১ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিতে দেখা যায় রায়ানকে। দেশে এডিস মশার সংক্রমণে সৃষ্ট ডেঙ্গু এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বাদ যাচ্ছে না ১০ দিন বয়সি শিশুও। তরুণ-যুবক-বৃদ্ধ আক্রান্ত সব বয়সি মানুষ। হাসপাতালে রোগীর চাপে হিমশিম পেতে হচ্ছে নার্স ও চিকিৎসকদের। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে বর্তমানে রোগী ভর্তি ছিল ৫২ জন।
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও সাত জনের। এই সময়ের মধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৫২ জন। শুধু চলতি অক্টোবর মাসের ১৭ দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৬৯২ জনে। আর এই ১৭ দিনে মৃত্যু হয়েছে ৯৭ জন ডেঙ্গু রোগীর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু বিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে উৎকণ্ঠায় আছেন মায়েরা। ১০ মাসের শিশু তাওহিদকে নিয়ে মিরপুর ১ নম্বর থেকে এসেছেন শিশুর মা আমেনা। জ্বরের পরে গায়ে দেখা দিয়েছে র্যাশ। এই মা বলেন, ‘আমার প্রথম বাচ্চা ৫৭ দিন বয়সে মারা গেছে। এই বাচ্চাও তিন মাস নিউমোনিয়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। ধারদেনা করে ৬ লাখ টাকা ব্যয় করেছি, এখন আবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। দোয়া করেন, যেন আমার বাচ্চাটার কিছু না হয়।’
এদিকে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারের উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব নিতে বলেছেন। ডেঙ্গু পরিস্থিতি, চিকিৎসাসেবা ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সরেজমিনে দেখতে গতকাল শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবন আকস্মিক পরিদর্শনে বের হয়ে এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে :চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৩৪২ জনে। আর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১০ হাজার ৩১২ জনে। এ পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৪ হাজার ১৯৯ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৫ হাজার ৭৭১ জন। ২০২৫ সালে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত যেখানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী ছিল ৫৮ হাজার ২৮০ জন, আর এই সময়ের মধ্যে মৃত্যু ছিল ২৪৩ জনের। সেখানে এ বছর ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৩১২ জন; আর মৃত্যু হয়েছে ৩৪২ জনের।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে। জ্বরের এক থেকে তিন দিনের মধ্যে ডেঙ্গুর—‘এনএস ওয়ান’ পরীক্ষা করে ফেলতে হবে। এখন যেহেতু ডেঙ্গুর মৌসুম চলছে, সরকারিভাবে ডেঙ্গুর পরীক্ষা সম্পূর্ণ ফ্রি। ডেঙ্গু পজিটিভ হলে শিশুদের ক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে ভর্তি হবে। ক্রিটিক্যাল ফেসটা হাসপাতালে কাটাতে পারলে ভালো। কারণ তখন রোগীর পালস প্রেশার কমে যায়, ২০ নামলে অ্যালার্মিং, বমি হয়, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়, খিঁচুনি হয়, প্লেটিলেট কমে যায়, রক্তক্ষরণ যদি শুরু হয়—যেমন স্ক্রিন বা দাঁতের গোড়া থেকে রক্ত যায়—তখন আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে পারি। এই রোগীগুলো হাতের কাছ থাকলে—বেশি খারাপ হয় না। এটিকে আমরা বলি ‘এক্সপান্ডেট ডেঙ্গু সিনড্রোম’। কিন্তু রোগী দেরিতে হাসপাতালে এলে, সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। কারণ ডেঙ্গুর রোগী দ্রুত খারাপের দিকে চলে যায়।
