এক দশকে সাড়ে চার হাজার অবৈধ পুকুর খনন

‘এবার আর কোনো জরিমানা নয়, জমির মালিককে সরাসরি জেল দেওয়া হবে’

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:৩৯

শস্যভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় তিন ফসলি উর্বর কৃষি জমি কেটে অবৈধ পুকুর খননকারীদের বিরুদ্ধে এবার কঠোর অবস্থানে রয়েছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। কৃষিজমি রক্ষা ও অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে কোথাও কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

ইতোমধ্যে শনিবার রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে উপজেলার বারুহাস ইউনিয়নের কাজিপুর গ্রামে একটি অবৈধ পুকুর খননে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। অভিযানে দুদু মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে অবৈধ পুকুর খনন ও সরকারি খাল ভরাট করার অপরাধে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই সাথে মাটি কাটার এস্কেভেটর মেশিন জব্দ করে পুকুর থেকে তুলে দেওয়া হয় এবং মাটি বহনে ব্যবহৃত একাধিক গাড়ির যন্ত্রাংশ অকেজো করে দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুল ইসলাম সাইফ দৈনিক ইত্তেফাককে জানান, তথ্য পাওয়ার সাথে সাথেই আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে আর্থিক জরিমানা আদায় করেছি। এই অসাধু চক্র যদি উক্ত পুকুর থেকে পুনরায় সামান্য পরিমাণ মাটিও কাটে, তবে এবার আর কোনো জরিমানা নয়, সরাসরি জমির মালিককে জেল দেওয়া হবে।

জেলা প্রশাসক ও জেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আমিনুল ইসলাম জানান, তাড়াশের কৃষি জমি রক্ষায় অবৈধ পুকুর খননকারীদের বিরুদ্ধে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৩ সর্বোচ্চ কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে। এছাড়া তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে প্রশাসন বিগত যেকোনো বছরের তুলনায় এবার সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ও কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

উপজেলার মাধবপুর, মথুরাপুর, বিদিমাগুড়া, চক গোপীনাথপুর, বোয়ালিয়া ও সোলাপাড়া সহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা জানান, কতিপয় অসাধু জমির মালিক নিজেদের স্বার্থে উর্বর জমি কেটে পুকুর বানানোর ফলে পুরো এলাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এতে বিস্তীর্ণ মাঠে বছরের পর বছর কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে এবং জমিগুলো কচুরিপানা ও ঘাসে ভরে থাকছে। কোনো ফসল ফলাতে না পেরে বিগত সাত বছর ধরে তারা পরিবার নিয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

কৃষকদের অভিযোগ, প্রতিবছর প্রকাশ্যে কৃষিজমি বিনষ্ট করা হলেও বিগত বছরগুলোতে প্রশাসন তা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে পারেনি। এর প্রতিবাদে তারা একাধিক মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও কৃষক সমাবেশ পরিচালনা করেছেন। এখনো কাউরাইল ও সোলাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় গোপনে পুকুর কাটার চেষ্টা চালাচ্ছে একটি অসাধু চক্র।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর তাড়াশ উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক রাজু জানান, তাড়াশের কৃষি পরিবেশ বাঁচাতে আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা জানান, তাড়াশের মাটি অত্যন্ত উর্বর এবং অধিকাংশ জমিতে বছরে তিনবার ধান ও রবিশস্য উৎপন্ন হয়। কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগী একটি চক্র অসাধু উপায়ে লাভবান হওয়ার জন্য কৃষকদের ভুল বুঝিয়ে পুকুর খননে উৎসাহিত করছে। সরকারি তথ্যমতে, গত এক দশকে কেবল তাড়াশ উপজেলাতেই সাড়ে চার হাজারের বেশি অবৈধ পুকুর খনন করা হয়েছে, যার ফলে প্রায় ১৩ হাজার বিঘা কৃষি জমি চিরতরে হারিয়ে গেছে।

প্রশাসনের এই সময়োপযোগী ও কঠোর পদক্ষেপের ফলে এবার অবৈধ পুকুর খনন পুরোপুরি বন্ধ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী কৃষকরা।

ইত্তেফাক/এএম