পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিচারিক রায়ের কপি চেয়েছে বাংলাদেশ। কপি হাতে আসার পর এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা করে মরদেহ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। গতকাল সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৃথকভাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির বলেছেন, দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় অবশ্যই তথ্যে এবং প্রক্রিয়ায় কোনো এক জায়গায় ঘাটতি রয়েছে। এটা খতিয়ে দেখার জন্য আমরা দুই পক্ষ কথাবার্তা বলছি।
গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবে নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির ও সিতি আক্তার নামে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) এক খবরে জানায়, মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’ করার দায়ে তাদের সাজা দেওয়া হয়েছে। সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী গ্রেফতার করে তদন্তের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে। পরে সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানো হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ঐ দুই বাংলাদেশিকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত। মক্কা অঞ্চলে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশের পর জানা যায়, ঐ দুই বাংলাদেশির বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনকে অবহিত করেনি সৌদি কর্তৃপক্ষ। পরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সৌদি আরবের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে ‘নোট ভার্বাল’ দিয়েছে বাংলাদেশ। এছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়াহ’কে ডেকে মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় তথ্য চেয়েছে ঢাকা। এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ। এ ঘটনায় সৌদি কর্তৃপক্ষের ‘কনস্যুলার সম্পর্কিত ভিয়েনা কনভেনশনের’ বিধান মেনে চলা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ বলেন, ২০২৩ সালে অভিযুক্তদের আটক করে সৌদি আরবের পুলিশ। এ সময়ের মধ্যে তাদের পরিবারের কোনো সদস্য সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। রায়ের কপি হাতে এলে তাদের পরিচয় ও দুই জনের মধ্যে কী সম্পর্ক ছিল, তা জানা যাবে। তিনি বলেন, সৌদির বিভিন্ন এলাকায় অনেক বাংলাদেশি কারাভোগ করছেন। নিয়মিতভাবে তারা বাংলাদেশের কাছে এ তালিকা পাঠায়, সেখানেও খতিয়ে দেখছে মন্ত্রণালয়। তিনি বলেন, আমরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। ধৈর্য ধরুন, রায়ের কপি হাতে পেলে বিস্তারিত জানানো যাবে।
শেখ হাসিনাকে নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আধাবেলার মধ্যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, পুরো মন্ত্রিসভা, এমনকি বায়তুল মোকাররম মসজিদের খতিবও দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। এটাকে কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। শেখ হাসিনাকে নিয়ে কথা বলা সময়ক্ষেপণ ছাড়া আর কিছু নয়।
অন্যদিকে দুই দেশ সফর শেষে দেশে ফিরে গতকাল সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, সৌদি আরবে যে প্রক্রিয়ায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে তা দুঃখজনক। সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশেষ করে, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটা ভালো এবং গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ ও সৌদি আরব জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ। যে ঘটনা ঘটেছে, এখানে তথ্য বিনিময়ের ঘাটতি রয়েছে। ঘাটতিটা কীসের জন্য হয়েছে তা খতিয়ে দেখার জন্য আমরা একটা ব্যাখ্যা চেয়েছি। এখানে অবশ্যই তথ্যের ও প্রক্রিয়ায় কোনো এক জায়গায় ঘাটতি রয়েছে। আমরা এটা খতিয়ে দেখার জন্য দুই পক্ষ কথাবার্তা বলছি।
তিনি বলেন, এটা অবশ্যই দুঃখজনক, অপরাধের অভিযোগ এনে যেভাবে দণ্ড কার্যকর হলো সেটা আমাদের জন্য হতাশার। কারণ, আল্লাহর ঘরের পবিত্রতা এবং মক্কা যাওয়ার উদ্দেশ্য মানুষের পবিত্রই হয়। যেটা আমরা শুনলাম এটা যদি হয়ে থাকে তাহলে স্বাভাবিকভাবে এটা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কোনো সুযোগ আছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, না, রায় কার্যকর হয়ে গেছে। হয়ে গেলে এটার আর সুযোগ থাকে না। এখন আমরা দেখব ঘাটতিটা কোথায়।
দুই বাংলাদেশির পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার প্রশ্নে হুমায়ুন কবির জানান, সেটা মিডিয়ার খবরে দেখেছেন। তিনি বলেন, এটা পরিষ্কার। আমরা যদি সৌদি আরবের কোনো ক্রিমিনালকে ধরি এখানে অবশ্যই তাদের জানাব। কনস্যুলার সার্ভিসেস সুযোগ পেতে পারে সে। তিনি বলেন, পবিত্র জায়গা, আল্লাহর বাড়ি মানুষ পবিত্র নিয়তে যায়। ওখানে গিয়ে ঐ ধরনের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়া তো ঠিক না, গ্রহণযোগ্য না। সুতরাং এখানে পরিষ্কার যদি ক্রাইম হয়ে থাকে এটার একটা আইন রয়েছে। তাদের লোকাল আইন রয়েছে, যে যায় সৌদি আরবে সে তা জানে।
ভারতের সঙ্গে কনস্যুলার ডায়ালগ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডায়ালগ হবে, ওখানে আলাপ আলোচনা হবে সব বিষয় নিয়ে; যেগুলো নিয়ে দুই পক্ষের আগ্রহ থাকবে।
