ইতালি যাওয়া হলো না সোহেলের, লাটভিয়ার জঙ্গলে করুণ মৃত্যু

একই চক্রের খপ্পরে দেশে দেশে ঘুরছেন ১২ যুবক

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৪৯

বৈধ পথে ইতালি যাওয়ার স্বপ্নে ৪৬ লাখ টাকা দিয়েও শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছানো হলো না ঝিনাইদহের সোহেল রানার। অভিযোগ উঠেছে, ইতালি পাঠানোর কথা বলে তাকে একের পর এক দেশে নেওয়া হয়, জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি করা হয় এবং নির্যাতনের শিকার হতে হয়। পরে লাটভিয়ার একটি জঙ্গল থেকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধারের পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৮ অক্টোবর তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় সোহেলের স্ত্রী জেসমিন সুলতানা ঝিনাইদহের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনালে ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

মামলায় অভিযুক্তরা হলেন- শামছুন্নাহার (৫৫), তার স্বামী শাহাজান সরকার(৫৮), তাদের দুই ছেলে সোহাগ (৩৫) ও নাসির সরকার (৩২), আবুল কালাম সরকারের ছেলে সোহেল রানা (৪১), শাহাজান সরকারের জামাই আব্দুর রাজ্জাক (৫০), সোহাগ সরকারের স্ত্রী তন্নি সরকার (৩২), রিয়াদ দেওয়ান (৩৫) ও শরিফুল সরকার ( ৪৮) কে আসামি করা হয়েছে। তাদের সবার বাড়ি রামচন্দ্রপুর গ্রামে।

অভিযোগে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২-এর ৬, ৭, ৮ ও ১০ ধারা এবং দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, সোহেলকে বৈধ পথে ইতালি পাঠানোর কথা বলে প্রথমে ২৬ লাখ টাকা নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল তাকে কাতারে পাঠানো হয়। সেখানে ৯০ দিনের মধ্যে ইতালি নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও তাকে কাজ দেওয়া হয়নি। পরে দেশে ফেরার জন্য টিকিট পাঠানো হলে তাকে ফিরতে না দিয়ে মিসর হয়ে ইতালি পাঠানোর কথা বলে আরও পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়। অভিযোগ, ওই টাকা দেওয়ার পর ২০২৬ সালের ১৪ আগস্ট তাকে মিসরে পাঠানো হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়, সোহেলকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় এবং তার পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া হয়। পরে তাকে বিভিন্ন দেশের মধ্য দিয়ে বেলারুশ হয়ে লাটভিয়ায় নেওয়া হয়। ২৫ আগস্ট তার ফোন ব্যবহার করে পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন তারিখে টাকা পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। ৯ অক্টোবর ইতালি থেকে অভিযুক্তদের একজন ফোন করে আরও সাড়ে চার লাখ টাকা দাবি করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

নিহত সোহেলের শ্যালক ইশতিয়াক আহমেদ জানান, সোহেলকে বৈধ পথে ইতালি পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তাকে বিভিন্ন দেশে ঘোরানো হয়। পরে বেশি কিছু দিন যোগাযোগ না থাকায় পোল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে তারা জানতে পারেন, লাটভিয়ার সীমান্তরক্ষীরা ৬ অক্টোবর তাকে জঙ্গল থেকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮ অক্টোবর সকালে তার মৃত্যু হয়। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি।

একই চক্রের শিকার এক সহযাত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাকেও বৈধ পথে ইতালি পাঠানোর কথা বলে কাতারে নেওয়া হয়েছিল। পরে জানতে পারেন, ইতালিতে পৌঁছাতে তাকে অবৈধ পথে সীমান্ত পার হওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে। বর্তমানে তিনি দালালের কথায় বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন এবং ওই পথে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। এছাড়া তিনিসহ ১২ জন এখনো বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন বলে তার জানা।

স্থানীয় ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম জানান, রামচন্দ্রপুর ও হালিধানী ইউনিয়নের অন্তত ১৫ জনের কাছ থেকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে টাকা নেওয়ার তথ্য তিনি পেয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তারা একসঙ্গে নৌপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে দালালদের মাধ্যমে যাত্রা করেছিলেন। এরপর থেকে তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ ১ যুগ ধরে তাদের পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষায় থাকলেও তাঁরা জীবিত আছেন, নাকি তাঁদের মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি।

মামলার বাদীর জেসমিন সুলতানা অভিযোগে উল্লেখ করেন, টাকা ফেরত বা আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে কথা বলতে গেলে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে তাকে হুমকি দেওয়া হয়। ১৫ অক্টোবর তিনি ঝিনাইদহ সদর থানায় গেলে আদালতে মামলা করার পরামর্শ পান বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন।

ইত্তেফাক/এএইচপি