কক্সবাজারের ইনানীর পাটুয়ারটেকের টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি ও অনিয়মের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় নানা অসংগতি ধরা পড়েছে। রিসোর্টের দুই মালিকের একজন আসামি হলেও অপরজনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এজাহারে উল্লেখ করা হয়নি ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া সতর্কতামূলক নোটিশের বিষয়টিও। এসব কারণে অভিযুক্তরা সহজে জামিন পেতে পারেন এবং কম সাজা হতে পারে বলে মনে করছেন কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান।
তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পূর্ব গোমদণ্ডী গ্রামের মো. তানভীর সুলতান মিয়া। তার বন্ধু পার্শ্ববর্তী এলাকার নিয়াজ মোর্শেদ ও দুজন যৌথ মালিকানায় কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেকে ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্ট’ গড়ে তোলেন। সেই রিসোর্টই গত ১৭ অক্টোবর আগুনে ভস্মীভূত হয়। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় ১০টি মরদেহ। আহত হন সাতজন। এখনো চারজন নিখোঁজ বলে দাবি করা হচ্ছে। এ ঘটনায় ওই রাতেই পুলিশ বাদী হয়ে উখিয়া থানায় একটি মামলা করে। মামলায় তানভীরকে এজাহারনামীয় প্রধান আসামি করা হলেও অপর যৌথ অংশীদার নিয়াজ মোর্শেদকে আসামি করা হয়নি।
এজাহার থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর রাত ৯টায় উখিয়া থানার এসআই আশিস সূত্রধর বাদী হয়ে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলাটি করেন। এজাহারনামীয় আসামিরা হলেন রিসোর্টের এক মালিক মো. তানভীর সুলতান মিয়া (৩৮), প্রধান ব্যবস্থাপক বরিশালের সাঈদ আহাম্মেদ (৩২), ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাঈদ (৩০) এবং সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমন (২৯)। এ ছাড়া রিসোর্টের ১৯ জন কর্মচারীকেও আসামি করা হয়েছে। তবে এজাহারে রিসোর্টটির অন্যতম অংশীদার নিয়াজ মোর্শেদের নাম নেই।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১৭ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৮টায় ৯৯৯-এ কল পেয়ে পুলিশ জানতে পারে, জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাটুয়ারটেকের টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এরপর মামলার বাদী একটি দল নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়ে দেখতে পান, ফায়ার সার্ভিসের দল ও স্থানীয় লোকজন আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। এরপর ঘটনাস্থল থেকে একে একে ১০টি পোড়া মরদেহ উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। এ ছাড়া গুরুতর আহত নয়জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। একই সময় ঘটনাস্থল থেকে রিসোর্টটির সহব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমনকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন জানান, রিসোর্টটির মালিক ও অন্য ব্যবস্থাপকেরা পলাতক রয়েছেন।
এজাহারে আরও উল্লেখ রয়েছে, রিসোর্টের ফায়ার লাইসেন্সের বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে আলোচনাকালে জানা যায়, টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের কোনো ফায়ার লাইসেন্স ছিল না।
তবে এজাহারে ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া সতর্কতামূলক নোটিশের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সিনিয়র স্টেশন অফিসার দোলন আচার্য্য বলেন, পুলিশকে ঘটনার দিনই জানানো হয়েছিল যে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এখন কেন এজাহারে বিষয়টি লেখা হয়নি, তা তারাই ভালো বলতে পারবে।
এজাহারে ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া নোটিশের বিষয়টি এবং রিসোর্টের এক মালিককে কেন আসামি করা হয়নি এমন প্রশ্নের জবাবে মামলার বাদী এসআই আশিস সূত্রধর বলেন, তিনি পূজার ছুটিতে আছেন। পূজা শেষে আগামী ২৭-২৮ অক্টোবর ফিরবেন। এরপর থানায় গিয়ে কথা বলতে বলেন।
এদিকে এত মর্মান্তিক একটি ঘটনায় দায়ের করা মামলায় একজন মালিককে বাদ দেওয়া এবং সুনির্দিষ্ট ধারার প্রয়োগ না করায় সমালোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের কেউ কেউ বলছেন, মামলার ধারা দুর্বল করে পুলিশ অভিযুক্ত পক্ষকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার আদালতের আইনজীবী বাপ্পী শর্মা বলেন, 'একটি আলোচিত অগ্নিকাণ্ড, সেখানে দায়সারা মামলা। এটি পুলিশের কাণ্ডজ্ঞানহীনতা ছাড়া আর কিছু নয়।' তিনি বলেন, টুপটুপ রিসোর্টটি যৌথ মালিকানার এটি সবাই জানেন। কিন্তু একজনকে আসামি করা এবং অন্যজনকে বাদ দেওয়া রহস্যজনক। এ ছাড়া নিরীহ কর্মচারীদের অজ্ঞাতনামা আসামি করাও আইনবহির্ভূত।
আরেক আইনজীবী ওয়াহিদ রুবেল বলেন, গণমাধ্যমের মাধ্যমে ঘটনার দিন থেকেই দেশবাসী জানতে পেরেছে, গত জুনে ফায়ার সার্ভিস রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্কতামূলক নোটিশ দিয়েছিল। কিন্তু পুলিশ এজাহারে বিষয়টি উল্লেখ না করায় মামলাটি দুর্বল হয়ে গেছে। এখন যে ৩০৪(ক) ধারায় মামলা করা হয়েছে, সেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর। অথচ ফায়ার সার্ভিসের সতর্কতামূলক নোটিশের বিষয়টি এজাহারে উল্লেখ করা হলে, তার মতে, মামলাটি এমন ধারায় হতে পারত, যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন এবং সর্বনিম্ন ১০ বছরের কারাদণ্ড।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান বলেন, রিসোর্টে আগুন লাগা ও মানুষের মৃত্যু সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অবহেলার বিষয়টি সামনে এনেছে। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অনুমোদন ছাড়া ভবন তৈরি হয় কীভাবে? ফায়ার লাইসেন্স ও পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি এত দিন চলল কীভাবে? প্রশাসনের অনুমোদন না থাকার পরও রিসোর্টটি কীভাবে চালু রাখা হয়েছিল?
তিনি বলেন, এসবই দায়িত্বহীনতার প্রমাণ। ঘটনার পর একজন মালিককে বাদ দিয়ে অন্যজনকে আসামি করা এবং দমকল বাহিনীর দেওয়া তথ্যের পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ না করাও দায়িত্বহীনতা। তার ভাষ্য, সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা দায়িত্ব পালন না করলে বিপর্যয় নেমে আসবেই।
কক্সবাজার দ্রুত বিচার আদালতের পিপি শওকত ওসমান বলেন, পুলিশ মামলাটি নিয়ে নয়ছয় করেছে, তা পরিষ্কার। কারণ, যৌথ মালিকানার ব্যবসায় একজনকে আসামি করা হলেও অপরজনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই এমন কর্মচারীদেরও মামলায় আসামি করা হয়েছে, যা আইনের পরিপন্থী। তিনি আরও বলেন, পুলিশ যে ধারায় মামলা করেছে, সেটি জামিনযোগ্য। আসামি আদালতে হাজির হলে জামিন পেতে পারেন। কিন্তু এজাহারে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হলে মামলাটি অজামিনযোগ্য ধারায় হতে পারত। দুটি ধারার শাস্তির ক্ষেত্রে বড় ব্যবধান রয়েছে।
তবে উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, মামলাটি দায়েরের সময় পুলিশ নিয়াজ মোর্শেদের নাম জানত না। এ কারণে এজাহারে আপাতত তার নাম নেই। তবে তাকে এ মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন। ওসি আরও বলেন, এটি এজাহার। এতে কোনো ভুল বা অসংগতি থাকলে চার্জশিট বা অভিযোগপত্রে তা সংযোজন করা হবে। তাদের চাওয়া, এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হয়।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র ছিল না। গত জুনে পরিদর্শনের পর স্থাপনাটিকে অনিরাপদ উল্লেখ করে সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তিনতলা কাঠের ভবনটির নিচতলায় রেস্তোরাঁ এবং ওপরের দুই তলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ও অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের স্থাপনা চালানো ঝুঁকিপূর্ণ।
এ ছাড়া কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অনুমোদনও নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে কউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন জানান, প্রতিষ্ঠানটির বৈধ কোনো অনুমোদন ছিল না। এ ব্যাপারে নোটিশ দেওয়া হলেও মালিকপক্ষ প্রতিষ্ঠানটি না সরিয়ে অবৈধভাবে কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। এর ফলে ১০টি তাজা প্রাণ অকালে ঝরে গেছে।
জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানান, ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে (এডিএম) প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ নমুনা ঢাকার সিআইডি কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরিচয় নিশ্চিত হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান জেলা প্রশাসক।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুনে উখিয়ার ইনানী মৌজায় গিয়াস উদ্দিন গংয়ের কাছ থেকে প্রায় এক কোটি টাকায় মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন ১০ শতক জমি কেনেন চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর বাসিন্দা তানভীর সুলতান মিয়া। পরে বন্ধু নিয়াজ মোর্শেদকে অংশীদার করে সেই জমিতে টুপটুপ রেস্টুরেন্ট গড়ে তোলেন। রিসোর্টটি নির্মাণের পর ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেন তারা।
