ধর্ম-বর্ণের সংকীর্ণ পরিচয়ে বিভাজিত না হয়ে দেশের সব নাগরিককে সমঅধিকার ও সম্প্রীতির বন্ধনে মিলেমিশে বসবাসের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় বৈষম্যহীন, সুখী-সমৃদ্ধ ও স্বপ্নের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায় সরকার। আর এই লক্ষ্য অর্জনে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষের আন্তরিক ঐক্য একান্ত প্রয়োজন।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জে এম সেন হলে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে আয়োজিত শুভেচ্ছা বিনিময় ও পূজামণ্ডপ পরিদর্শন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের আপামর জনতা জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছিল। সেদিন কেউ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান পরিচয় খোঁজেনি। স্বাধীনতার পরও যখনই গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের ওপর আঘাত এসেছে, মানুষ দলমত নির্বিশেষে কথা বলার অধিকার রক্ষায় রাজপথে নেমেছে।
স্মরণকালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারকে দেশ ছাড়া করা হয়েছে। প্রতিটি জেলায় লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল, সেদিনও কারও ধর্মীয় পরিচয় দেখা হয়নি। গুলিবিদ্ধ আহত মানুষকে সবাই মিলে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন, রাজপথে রক্ত দিয়েছেন। সবার একটাই লক্ষ্য ছিল—গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।’
সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সংখ্যালঘু বিতর্ক নাকচ করে দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘এই দেশ আমাদের সবার। কেউ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান—যে ধর্মেরই হোন না কেন, সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু বলে কোনো বিভাজন এখানে গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের আইন ও সংবিধানে একজনের জন্য যা প্রযোজ্য, অন্যের জন্যও ঠিক তা-ই প্রযোজ্য। রাষ্ট্র সবার নাগরিক অধিকার সমানভাবে নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
এর আগে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাদের অভ্যর্থনা জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনসহ স্থানীয় সংসদ সদস্য ও শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
রাত ৮টা ২০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর জে এম সেন হলে পৌঁছালে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি অধ্যাপক অর্পণ ব্যানার্জি, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিখিল কুমার নাথ, জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের কার্যকরী সেক্রেটারি বিপ্লব দে পার্থ এবং হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি রাজীব ধর তমাল তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সব সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে এক অনন্য জাতীয় ঐক্যের মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে। অতীতে নাগরিক নিরাপত্তা ও ভিন্নমত দমনের যে কালো অধ্যায় ছিল, বর্তমান সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ সেখান থেকে উত্তরণের স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায় যেখানে ধর্মীয় পরিচয় বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে কোনো বিভাজন বা বৈষম্য থাকবে না। তিনি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশে বলেন, কেউ যেন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহৃত না হন; একজন স্বাধীন নাগরিক হিসেবে সবার মতো তাদেরও সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক সমান অধিকার রয়েছে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
পূজামণ্ডপের অনুষ্ঠান শেষে রাত ১০টায় নগরীর পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লুতে চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগর বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতাদের নিয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সাংগঠনিক সভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময় সভায় প্রায় পাঁচ শতাধিক ডেলিগেট উপস্থিত ছিলেন।
