সন্তানের জীবনে পিতা-মাতার অবদান, ত্যাগ ও ভালোবাসার স্থান সবার ওপরে। ইসলাম তাদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান ও সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। তবে মানুষ হিসেবে কোনো পিতা-মাতাই ভুলের ঊর্ধ্বে নন। কখনো ধর্মীয় বিধানে শিথিলতা, কখনো কারও প্রতি অবিচার কিংবা পারিবারিক জটিলতায় অদূরদর্শী কোনো সিদ্ধান্ত তাদের মাধ্যমেও সংঘটিত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে একজন আদর্শ সন্তান হিসেবে নীরব না থেকে শ্রদ্ধার পরম মর্যাদা বজায় রেখে অত্যন্ত প্রজ্ঞা, বিনম্রতা ও ভালোবাসার সঙ্গে তাদের ভুল শুধরে দেওয়ার তাগিদ দিয়েছে ইসলাম।
পিতা-মাতার ভুলভ্রান্তি সংশোধনে ইসলামের সুনির্দিষ্ট মূলনীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। পিতা-মাতা ভুল করলেও তাদের প্রতি কোনো ধরনের কটূক্তি করা, ক্রোধ প্রকাশ করা বা অপমানজনক আচরণ করা যাবে না। কথা বলার সময় কণ্ঠস্বরকে রাখতে হবে নিচু ও মার্জিত। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার সঙ্গে শিষ্টাচারের নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেছেন—
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا
‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন বা উভয়ই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদের “উফ” বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা আল-ইসরা: আয়াত ২৩)
পিতা-মাতাকে ভুল বোঝানোর ক্ষেত্রে নবী হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ঐতিহাসিক আচরণ এক অনন্য শিক্ষা। তার পিতা আজর প্রকাশ্য মূর্তিপূজায় লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত নম্র ভাষায় ‘হে আমার প্রিয় পিতা’ সম্বোধন করে সত্যের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কুরআনে তার সেই আহ্বানটি এভাবে চিত্রিত হয়েছে—
اِذۡ قَالَ لِاَبِیۡهِ یٰۤاَبَتِ لِمَ تَعۡبُدُ مَا لَا یَسۡمَعُ وَ لَا یُبۡصِرُ وَ لَا یُغۡنِیۡ عَنۡكَ شَیۡئًا
‘যখন তিনি তার পিতাকে বললেন, হে আমার পিতা! আপনি তার ইবাদাত করেন কেন যা শোনে না, দেখে না এবং আপনার কোনো কাজেই আসে না?’ (সুরা মারইয়াম: আয়াত ৪২)
এমনকি পিতা হুমকি দেওয়া সত্ত্বেও হজরত ইবরাহিম (আ.) শান্ত থেকে পিতার জন্য শান্তি ও দোয়ার বাণী পৌঁছে দেন, যা প্রমাণ করে সংশোধনের পথে ভাষার সৌন্দর্য ও শ্রদ্ধা বজায় রাখা অপরিহার্য।
পিতা-মাতার ভুল ধরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সন্তানকে কয়েকটি প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করতে হয়। কোনো বিষয় নিজের অপছন্দ হলেই তা অন্যায় হয়ে যায় না; তাই শরিয়তের মানদণ্ডে বা যুক্তির নিরিখে বিষয়টি সত্যিই ভুল কি না, তা কোরআন-সুন্নাহর দলিল ও গ্রহণযোগ্য মতামতের ভিত্তিতে নিশ্চিত হতে হবে। আলেমদের গ্রহণযোগ্য মতভেদপূর্ণ কোনো বিষয়কে একমাত্র নিজের মত ঠিক দাবি করে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। সংশোধনের কথা বলতে হবে নির্জন পরিবেশে একান্তে ও নরম সুরে, সবার সামনে নয়। ‘আপনি সব সময় ভুল করেন’—এমন আক্রমণাত্মক ভঙ্গির বদলে ‘আমি বিষয়টির বিধান এভাবে জেনেছি, আপনি কি একটু ভেবে দেখবেন?’—এভাবে বিনীত পরামর্শের সুরে তুলে ধরতে হবে। এর পাশাপাশি সন্তানের নিজের চরিত্র ও আচরণ সৎ এবং মার্জিত হওয়া জরুরি, অন্যথায় কথার কোনো প্রভাব পিতা-মাতার ওপর পড়ে না।
পিতা-মাতা যদি কোনো অন্যায় কাজ, মিথ্যা সাক্ষ্য, জুলুম বা অন্যের হক নষ্ট করার মতো গুনাহের নির্দেশ দেন, তবে তা মানা যাবে না। স্রষ্টার অবাধ্য হয়ে সৃষ্টির আনুগত্য করার অবকাশ ইসলামে নেই। তবে এই অমান্যের ক্ষেত্রেও কঠোরতা বা অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَ اِنۡ جَاهَدٰكَ عَلٰۤی اَنۡ تُشۡرِكَ بِیۡ مَا لَیۡسَ لَكَ بِهٖ عِلۡمٌ ۙ فَلَا تُطِعۡهُمَا وَ صَاحِبۡهُمَا فِی الدُّنۡیَا مَعۡرُوۡفًا ۫ وَّ اتَّبِعۡ سَبِیۡلَ مَنۡ اَنَابَ اِلَیَّ ۚ ثُمَّ اِلَیَّ مَرۡجِعُكُمۡ فَاُنَبِّئُكُمۡ بِمَا كُنۡتُمۡ تَعۡمَلُوۡنَ
‘তারা যদি তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কিছুকে শরিক করতে চাপ দেয়, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তাদের আনুগত্য করো না। তবে দুনিয়ায় তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করো। আর অনুসরণ কর তার পথ, যে আমার অভিমুখী হয়। তারপর আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তখন আমি তোমাদেরকে জানিয়ে দেব, যা তোমরা করতে।’ (সুরা লুকমান: আয়াত ১৫)
অন্যায় প্রতিরোধে সাধ্যমতো চেষ্টা করার বিধান থাকলেও পিতা-মাতার ওপর জোরজবরদস্তি করা যাবে না, কারণ হেদায়েত দেওয়ার মালিক আল্লাহ; সন্তানের দায়িত্ব কেবল বিনম্রভাবে বোঝানো ও দোয়া করা। বারবার বোঝানোর পরও কাজ না হলে বিরক্তি সৃষ্টি না করে উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করতে হবে। পরিবারে শ্রদ্ধেয় কোনো প্রবীণ আত্মীয় বা বিজ্ঞ আলেমের সহায়তা নিয়েও বোঝানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বিশেষ করে স্ত্রী ও পিতা-মাতার মতবিরোধে কোনো এক পক্ষকে অন্ধভাবে সমর্থন না করে ন্যায়পরায়ণ থাকতে হবে। তবে কোনো গুরুতর নির্যাতন বা অন্যের ক্ষতির বিষয় থাকলে সেখানে নীরব না থেকে দায়িত্বশীল অভিভাবক বা আইনি সমাধান খোঁজা আবশ্যক।
পিতা-মাতার কোনো পাপ বা ভুলের দায়ভার সন্তানের ওপর বর্তাবে না। কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা—‘কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।’ (সুরা আল-আনআম: ১৬৪; সুরা ফাতির: ১৮)। তবে পরিবারের সুন্দর পরিবেশ ও মানসিক শান্তির স্বার্থে নিজের আমল ঠিক রেখে পিতা-মাতার জন্য অব্যাহত দোয়া ও আন্তরিক চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই একজন সচেতন সন্তানের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
