বিশ্লেষণ

উদ্দেশ্য ভালো হলেও ক্ষমতার দাপট ও বাড়াবাড়ি অগ্রহণীয়

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৯

আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানের জেরে ইশরাক হোসেনের মন্ত্রিত্ব হারানোর ঘটনা এখন দেশের সর্বাধিক আলোচনার বিষয়। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সর্বত্র এ নিয়ে চলছে নানামুখী আলোচনা ও বিশ্লেষণ। পক্ষে-বিপক্ষের সব আলোচনার উপসংহার হলো ‘উদ্দেশ্য ভালো হলেও ক্ষমতার দাপট এবং সীমা লঙ্ঘন বা বাড়াবাড়ি অগ্রহণীয়।’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে সোমবার দুপুরে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর থেকে গতকাল মঙ্গলবার দিনভর রাজধানীর পাড়া-মহল্লা, দোকানপাট সর্বত্র এ নিয়ে আলোচনা-বিশ্লেষণ চলছে। এ রকম কয়েকটি আলোচনায় কেউ কেউ বলছিলেন, যে কোনো রাজনৈতিক নেতা কিংবা জনপ্রতিনিধির কাছে সাধারণ মানুষ মাদকবিরোধী শক্ত অবস্থান প্রত্যাশা করে। নিজ নির্বাচনি এলাকায় (ঢাকা-৬) মাদকের বিরুদ্ধে ইশরাকের যে অবস্থান ও প্রতিবাদী কণ্ঠ তা সমর্থনযোগ্য। কিন্তু, যে কায়দায় তিনি অভিযানে গিয়েছিলেন তা অন্যায্য। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, এমনকি প্রতিমন্ত্রী এভাবে নিজের দল-বল নিয়ে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে এটা করতে পারেন না। এটা একদিকে যেমন একজন আইন প্রণেতার নিজেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রকাশ্য প্রবণতা প্রদর্শন, তেমনি দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অনাস্থার ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ।

জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও ইশরাকের ঘটনাকে এভাবেই বিবেচনা করেছেন। গতকাল নিজ নির্বাচনি এলাকায় তিনি বলেছেন, ‘মাদক নির্মূলের জন্য ইশরাকের উদ্দেশ্য ভালো ছিল। কিন্তু এভাবে অস্ত্র হাতে নেওয়া শোভা পায় না। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগ করতে বলেছেন এবং তিনি পদত্যাগ করেছেন।’

ইশরাকের অস্ত্রকাণ্ড ও পদত্যাগ নিয়ে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা-বিশ্লেষণে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজপথে তার ‘সাহসী’ ভূমিকার কথাও উঠে আসছে। মিছিল-সমাবেশে তার নিয়মিত ও সক্রিয় অংশগ্রহণ, একাধিকবার কারাবরণ, অন্যায়ের প্রতিবাদে মারমুখী পুলিশের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো, ঝুঁকি নিয়ে পুলিশের কাছ থেকে দলীয় কর্মীকে ছাড়িয়ে নেওয়া, বিশেষত কর্মীবান্ধব গুণের কথাও বলছেন অনেকে। একই সঙ্গে প্রকৌশল বিদ্যায় স্নাতকোত্তর ও ৩৯ বছর বয়সি ইশরাককে নিয়ে আলোচনায় ঘুরে-ফিরে তার প্রয়াত বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার প্রসঙ্গও উঠে আসছে। অবিভক্ত ঢাকার একসময়ের মেয়র সাদেক হোসেন খোকার পুত্র ইশরাকের কাছে ঢাকাবাসীর প্রত্যাশার কথাও বলছেন কেউ কেউ।

একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করা নূরুজ্জামান, গার্মেন্টস ব্যবসায়ী অপু ও বেসরকারি চাকরিজীবী নাজমুল গতকাল রাজধানীর মালিবাগে একটি কফির দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। তাদের আলোচনারও বিষয় ছিলেন ইশরাক হোসেন। আলোচনার সারাংশ ছিল, মন্ত্রিত্ব হারানোর এই ঘটনাটি শুধু একজন তরুণ প্রতিমন্ত্রীর বিতর্কে জড়িয়ে পড়াতেই সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না। এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতা ও মন্ত্রীদের আচরণ কতটুকু পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হবে সে বিষয়ে সতর্কবার্তা হিসেবেও দেখতে হবে। কারণ, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দল ও নেতাদের ওপর দেশের মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। শক্তি প্রয়োগ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রবণতা থেকে রাজনীতিকেরা কতটা বের হতে পারলেন—এটাও মানুষ দেখতে চায়।

মাত্র ১৯ দিন আগে, গত ১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) পদ ছাড়তে হয়েছিল ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে; ইশরাককে নিয়ে আলোচনার মধ্যে এই ইস্যুও আসছে। রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় নাম আসায় বিএনপি দলীয় এই সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। এমপি হিসেবে শপথ গ্রহণের মাত্র সাড়ে পাঁচ মাসের মাথায় তাকে এমপি পদ হারাতে হয়েছে। এমনকি, দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকান্ডের দায়ে সংরক্ষিত আসনের কোনো নারী সদস্যের এমপি পদ হারানোর ঘটনা এটিই প্রথম।

ইশরাক ও মিষ্টিকে নিয়ে বিশ্লেষকদের প্রায় সবাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই কঠোর অবস্থানের প্রশংসা করছেন। তাদের মতে, এই দুটি ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই কড়া বার্তাই দিতে চেয়েছেন যে মন্ত্রী, এমপি বা দলের যেই হোন না কেন, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ালে ছাড় নেই। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, হামলা, ভাঙচুর ও অবৈধ দখলের মতো কর্মকাণ্ডে জড়ানোর মাধ্যমে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের পাশাপাশি সরকারের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্নকারীদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর এই কঠোর অবস্থান যেন জারি থাকে, সেই প্রত্যাশার কথাও বলছেন সাধারণ মানুষ। একই সঙ্গে অপরাধী যে দলেরই বা যেই হোক, তাকে আইনের ও জবাবদিহির আওতায় আনার ওপরও গুরুত্বরোপ করছেন তারা।

ইত্তেফাক/এনএন