পাহাড়ের ঢালে ঢালে পাকা ধানের সোনালি আভা। কোথাও চলছে ধান কাটার উৎসব, কোথাও পাকা ফসল পাহারা দিচ্ছেন জুমচাষিরা। ফসল ঘরে তোলার ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁদের মুখে হাসির আড়ালে রয়েছে জীবিকা নিয়ে শঙ্কা। কারণ, পার্বত্য চট্টগ্রামে দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে জুমচাষের জমি, কমছে ফসলের উৎপাদনও। অনুকূল আবহাওয়ায় চলতি বছর অনেক এলাকায় ভালো ফলন হলেও দীর্ঘমেয়াদে এই ঐতিহ্যবাহী কৃষিব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে জুমচাষিদের।
চলতি বছর খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান—এই তিন পার্বত্য জেলায় প্রায় ৬৮ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে জুমচাষ হয়েছে। এতে ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৬ হাজার ৬৮১ মেট্রিক টন। জুমের প্রধান ফসল বিভিন্ন জাতের ধান। পাশাপাশি হলুদ, আদা, মারফা, শিম, মিষ্টিকুমড়া, আমিলা, তিল, চিনাল, ভুট্টা, মরিচ ও বেগুনসহ ৩৫ থেকে ৪০ ধরনের ফসল আবাদ করেন চাষিরা।
পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সবুজ পাহাড়ের বুকজুড়ে এখন পাকা ধানের সোনালি আভা। পাহাড়ের ঢালে ঢালে চলছে ধান কাটার উৎসব। কোথাও ধান কাটার ব্যস্ততা, কোথাও আবার পাকা ধান পাহারা দিতে ব্যস্ত জুমচাষিরা। কিছু এলাকায় জুমের ধান এখনো সবুজ। ধানের পাশাপাশি অন্যান্য ফসল ঘরে তোলার কাজও শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে তিন পার্বত্য জেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এখন দম ফেলার ফুরসত নেই জুমচাষিদের।
জুমচাষিরা জানান, চলতি বছর সময়মতো বৃষ্টিপাত হওয়ায় ধান বপনের কাজে খুব বেশি ব্যবধান হয়নি। ফলে অনেক এলাকায় তুলনামূলক ভালো ফলন পাওয়া গেছে। তবে পাহাড়ের সব এলাকায় সমান বৃষ্টিপাত না হওয়ায় জুমের ধান একই সময়ে পাকে না। বৈশাখের শুরুতে প্রথম বৃষ্টির পর যাঁরা ধান বপন করতে পেরেছেন, তাঁদের জমির ধান আগে কাটার উপযোগী হয়েছে। কোথাও ধান পাকার সঙ্গে সঙ্গেই কাটার কাজ শুরু হয়েছে, আবার কোথাও চলছে পাকার অপেক্ষা।
পাকা ধান ও অন্যান্য ফসল পাহারা দিতে অনেক জুমচাষি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জুমঘরে অবস্থান করছেন। কেউ কেউ ধান কাটার আগেই মিষ্টিকুমড়া, ভুট্টা, মারফা ও চিনালসহ বিভিন্ন সাথি ফসল সংগ্রহ করে হাটবাজারে বিক্রি করছেন। সাধারণত আগস্টের শেষ দিকে অথবা সেপ্টেম্বরের শুরুতে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় জুমের ধান কাটা শুরু হয়। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরজুড়ে চলে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজ। ধান শুকানোর পর জুমঘর থেকে তা মূল ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়।
তবে জুমচাষের এই মৌসুমি ব্যস্ততার আড়ালে জমি কমে যাওয়া ও উৎপাদন হ্রাসের বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাহাড়ি টিলায় ফলের বাণিজ্যিক বাগান গড়ে তোলা, পরিকল্পিত বনায়ন এবং পর্যাপ্ত বিরতি না দিয়ে একই জমিতে বারবার চাষের কারণে জুমভূমির পরিমাণ কমছে। পাশাপাশি ঘন ঘন চাষাবাদের ফলে পাহাড়ি জমির উর্বরতাও হ্রাস পাচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে খাগড়াছড়িতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ হেক্টর পাহাড়ি জমিতে জুমচাষ হয়েছিল। চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৫০ হেক্টরে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে জুমচাষের জমি কমেছে ১ হাজার ৩৫০ হেক্টর, যা মোট জমির প্রায় ৫৪ শতাংশ।
রাঙামাটিতেও কমেছে জুমচাষের জমি। গত বছর জেলার ১০ উপজেলায় ৭ হাজার ৬৪৮ হেক্টর জমিতে জুমচাষ হয়েছিল। এ বছর হয়েছে ৬ হাজার ৫১০ হেক্টরে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জমির পরিমাণ কমেছে ১ হাজার ১৩৮ হেক্টর। অন্যদিকে বান্দরবানে গত বছর ৮ হাজার ২৬৭ হেক্টর জমিতে জুমচাষ হয়েছিল। এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৩৬০ হেক্টরে। তবে জেলায় চলতি বছরের জুমচাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর।
খাগড়াছড়ির দীঘিনালার সীমানাপাড়া এলাকার কারবারি (পাড়াপ্রধান) চয়ন ত্রিপুরা বলেন, “আমাদের এই দুর্গম এলাকায় আগে থেকেই জুমচাষ হয়ে আসছে। কিন্তু বর্তমানে অনেক বাগান তৈরি হয়েছে, সেগুনবাগান হয়েছে, বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগানো হয়েছে। এসব কারণে জুমচাষির সংখ্যা কমে গেছে। জনসংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু জমি বাড়েনি। সব মিলিয়ে আমাদের এলাকায় জুমচাষ অনেক কমে গেছে।”
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, “জুমচাষ কেবল একটি কৃষিব্যবস্থা নয়, এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাদ্য, জীবিকা, সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু ভূমির সংকোচন, বসতি ও বাণিজ্যিক কৃষির বিস্তার, সংক্ষিপ্ত জুমচক্র, জলবায়ুর অনিশ্চয়তা এবং তরুণ প্রজন্মের অনাগ্রহে এ কৃষিপদ্ধতি আজ সংকটে।”
জুমভূমি সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি কমছে ফসলের উৎপাদনও। রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের সীতা পাহাড়ে জুমচাষ করেন সানু মারমা। তিনি বলেন, “আগে আমরা এক হাঁড়িতে ৫০ থেকে ৬০ আঁটি ধান পেতাম। কিন্তু এ বছর এক হাঁড়িতে ধান পেয়েছি মাত্র ২৫ আঁটি বা তারও কম। আগের তুলনায় ফলন অর্ধেক বা তারও কমে গেছে। আগামী বছর চাষ করতে পারব কি না, তা নিয়েই ভীষণ চিন্তায় আছি।”
খাগড়াছড়ির দীঘিনালার সীমানাপাড়া এলাকার জুমচাষি মিলন ত্রিপুরা জানান, এ বছর তিনি তিন হাঁড়ি জমিতে জুমের ধান চাষ করেছেন। তবে আগের তুলনায় ফলন কমেছে। উৎপাদন ধরে রাখতে এখন সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে খরচ বাড়লেও সেই অনুপাতে লাভ হচ্ছে না।
মিলন ত্রিপুরা বলেন, “আমার নিজস্ব জমি নেই। জুমচাষ করে ৩০ থেকে ৩৫ মণ ধান পাই। কিন্তু এখন সার দিতে হয়, কীটনাশক দিতে হয়। সব মিলিয়ে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সেই তুলনায় লাভ হয় না। ছেলেমেয়েরাও জুমচাষে আসতে চায় না।”
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, পাহাড়ে ফলের বাগান বেড়ে যাওয়ায় জুমচাষের জমি কমছে। জুমে ধানের উৎপাদন বাড়াতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এ বছর চাষিদের পাঁচ কেজি করে ধানের বীজ ও ২০ কেজি করে রাসায়নিক সার দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) পক্ষ থেকেও বীজ সরবরাহ করা হয়েছে।
তিনি জানান, ব্রি ধান-৮৩, বিনা ধান-১৯ ও বিনা ধান-২১ জাতের ধান জুমে চাষ করা হয়েছে। এ বছর তিনটি জাতেরই ভালো ফলন হয়েছে বলে তাঁর মত। পাশাপাশি জুমে আধুনিক জাতের ফসল উৎপাদনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন।
রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, পাহাড়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে খাদ্যের চাহিদা বেড়েছে। এ কারণে নির্দিষ্ট বিরতি বা গ্যাপ না দিয়েই একই জমিতে ঘন ঘন জুমচাষ করা হচ্ছে। এতে পাহাড়ি জমিতে আগের মতো পর্যাপ্ত জৈব পদার্থ থাকছে না। ফলে প্রতিবছর জুমের উৎপাদন কমছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষকদের দীর্ঘ বিরতি দিয়ে জুমচাষ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জুমচাষ পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের খাদ্য, জীবিকা ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু জমির সংকোচন, মাটির উর্বরতা হ্রাস, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ এই কৃষিব্যবস্থাকে ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জুমচাষ টিকিয়ে রাখতে জমির সঠিক ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত বিরতি নিশ্চিত করা এবং উৎপাদন বাড়াতে কার্যকর কৃষি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
