ফ্রান্সের আন্দোলনকারীদের স্লোগানে ‘বিসমিল্লাহ’, উৎপত্তি হলো যেভাবে

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:৫১

গত সপ্তাহে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সমর্থনে রাস্তায় নেমে আসেন লাখ লাখ মানুষ । এ সময় অনেকের হাতে থাকা কার্ডবোর্ডের প্ল্যাকার্ডে দেখা যায় একটি স্লোগান, ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’।

আরবি শব্দ ‘বিসমিল্লাহ’ অর্থ ‘আল্লাহর নামে শুরু’। আর ফরাসি বাক্যাংশ ‘সে লে তেনেব্র’ অর্থ ‘এটি অন্ধকার’। এ দুইয়ের মিশেলে তৈরি হয়েছে স্লোগানটি। বাক্যটির অর্থ আপাতদৃষ্টিতে অস্পষ্ট মনে হতে পারে।

তবে গত মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষা সরঞ্জামের অভাবে তরুণদের প্রতিবাদ শুরু হওয়ার পর থেকে এই স্লোগান একটি প্রজন্মগত ব্যবধানের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ওই বিক্ষোভ পরে ব্যাপক সহিংসতায় রূপ নিয়েছিল।

কোথা থেকে স্লোগানটির উৎপত্তি

ধারণা করা হচ্ছে, স্ন্যাপচ্যাটে প্রকাশিত একটি বার্তা থেকেই স্লোগানটির সূত্রপাত। ফ্রান্সের শিক্ষার্থী আন্দোলনের আয়োজকদের একটি ব্যক্তিগত চ্যাট গ্রুপে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন এমন এক ব্যক্তি বার্তাটি পাঠান।

বার্তার শুরুতে লেখা ছিল ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’, যা ফ্রান্সের তরুণদের মধ্যে প্রচলিত আরবি ও ফরাসি ভাষার মিশ্র কথ্যরীতির অনুকরণ বলে মনে হয়। এরপর ওই ব্যক্তি লেখেন, ‘আমরা সবকিছু ভেঙে ফেলব।’

ফ্রান্সে আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের হাতে ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। ছবি: রয়টার্স

লেখক মামাদৌ ও আবদুল্লাহর মতো নাম এবং আলজেরিয়ার পতাকার ইমোজি ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রোফাইল থেকে কয়েকবার বার্তাটি পাঠানো হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

অন্যান্য স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহারকারী এই বাক্যকে হাস্যকর মনে করে বার্তার স্ক্রিনশট নেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন। নিউইয়র্ক টাইমস বার্তাগুলোর মূল উৎস যাচাই করতে পারেনি।

এরপর কী ঘটল

অনেক তরুণের সন্দেহ, বার্তাগুলো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এসেছে। তাঁরা আনাড়িভাবে শিক্ষার্থী প্রতিবাদ আন্দোলনে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছিলেন।

বিক্ষোভকারীরা দ্রুত ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ বাক্যটিকে একটি ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। তাদের আন্দোলনকে দমন করতে কর্তৃপক্ষ যে চেষ্টা চালাচ্ছে, তাকে উপহাস করা–ই ছিল এই স্লোগানের উদ্দেশ্য।

এই স্লোগানকে এখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং আন্দোলনকারীদের বিশেষ করে শিক্ষার্থী, কৃষ্ণাঙ্গ ও আরব বংশোদ্ভূত ফরাসিদের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার একটি রূপক হিসেবে অভিব্যক্তি দেখা হচ্ছে। ফরাসি উপনিবেশগুলোর সাবেক বাসিন্দাদের সন্তান, কৃষ্ণাঙ্গ এবং আরব ফরাসিরা দীর্ঘদিন ধরে কর্তৃপক্ষের বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। বার্তাগুলোর মাধ্যমে তাদের ভুলভাবে তুলে ধরার পুলিশের চেষ্টা হিসেবে অভিযোগ করে আসছেন তারা।

জানতে চাইলে ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের এজেন্টরা এ ধরনের বাক্যটি ব্যবহার করেছে কি না, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে তারা স্বীকার করেছে, আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তারা মাঝেমধ্যে অনলাইনে ছদ্মবেশ ধারণ করেন, যাতে বিক্ষোভে বেআইনি কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনাকারীদের ওপর নজরদারি রাখা যায়।

মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, এই প্রেক্ষাপটে, তদন্তকারী এজেন্টের একটি ছদ্মনাম তৈরি করার সুবিধা রয়েছে, যাতে ‘অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের যোগাযোগ বের করে সংরক্ষণ করা যায় এবং আইনি প্রক্রিয়ায় এসব কিছু প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।’

কেন স্লোগানটি এতটা সাড়া ফেলল

শিক্ষার্থী আন্দোলনকারীদের কাছে এই অদ্ভুত বাক্যটি তাদের আন্দোলন এবং সরকারের মধ্যকার প্রজন্মগত ব্যবধানকে স্পষ্ট করে তুলেছে। সরকার তাদের দাবি মানতে অনেকটা অস্বীকৃতি জানিয়েছে বলে তাদের কাছে মনে হচ্ছে।

ফ্রান্সের প্রভাবশালী শিক্ষার্থী ইউনিয়নের মুখপাত্র সাবরিন খারবাচ বলেন, কোনো তরুণ এভাবে কথা বলে না। তরুণেরা এই বাক্যটিকে তাদের নিজস্ব করে নিয়েছে এটা বোঝাতে, তাদের আন্দোলনে নজরদারি বা অনুপ্রবেশের চেষ্টা চোখ এড়িয়ে যায় না। তারা সেগুলোর তোয়াক্কা না করেই নিজেদের গুছিয়ে নিতে সক্ষম।

বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদানি সাবাদি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, স্ন্যাপচ্যাট বার্তাগুলো কর্তৃপক্ষের একধরনের ‘পূর্বসংস্কার বা অন্ধবিশ্বাস’–কে তুলে ধরেছে। কারা ব্যারিকেড তৈরি করছে বা ‘সবকিছু ভেঙে ফেলার’ চেষ্টা করছে, সেটা যেন তারা অনুমান করে ফেলেছে।

প্যারিসের উচ্চবিদ্যালয়ের ফেদ্রে কেমেন নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ জাতীয় কৌতুকে পরিণত হয়েছে। কারণ, ‘এটি একজন তরুণের অত্যন্ত বাজে এক নকল রূপ’।

ফেদ্রে আরও যোগ করেন, বাক্যটি বর্ণবাদের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এই বাক্যের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, যারা সম্পত্তি ভাঙচুর করতে যাচ্ছে, তারা সবাই আরব।

ফ্রান্সের বাইরে এই স্লোগান কীভাবে ছড়াল

‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ স্লোগানটি বেলজিয়াম ও জার্মানির অনুরূপ বিক্ষোভেও ব্যবহার করা হয়েছে।

সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ শিক্ষার্থী আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা ভিডিওতে এই বাক্যটি উচ্চারণ করেছেন। ভিডিওতে থুনবার্গ ‘জেন-জি’ প্রজন্মের তরুণদের অন্যান্য অঙ্গভঙ্গিও দেখান। এর মধ্যে ‘সিক্স-সেভেন’ সম্পর্কিত একটি অঙ্গভঙ্গিও ছিল, যা মিম হিসেবে বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল।

নতুন এই স্লোগানের ব্যবহার ভারতের ‘ককরোচ আন্দোলন’-এর হাস্যরসের সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে শিক্ষার্থীরা উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে এক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল। ভারতের প্রধান বিচারপতি তরুণ ও বেকার ভারতীয়দের ‘পরজীবী’ এবং ‘রুই-কাতলা/কাকরোচ’ (তেলাপোকা) বলে ব্যঙ্গ করার পর প্রতিবাদকারীরা তাদের আন্দোলনের নামকরণ করেছিলেন সেই ব্যঙ্গাত্মক শব্দের নামে।

ইত্তেফাক/এমএস