ভারতে তিন খ্রিষ্টান পরিবারের ওপর হামলা, দুর্গাপূজায় আচার পালনে বাধ্য করার অভিযোগ

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ২২:২৩

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার চন্দ্রকোনা থানা এলাকায় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের তিনটি পরিবারের সদস্যদের মারধর, জোর করে দুর্গাপূজার মণ্ডপে নিয়ে ধর্মীয় আচার পালনে বাধ্য করা এবং এক নারীকে প্রকাশ্যে শুদ্ধীকরণের নামে গোসল করানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

১৮ থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এসব ঘটনার পর এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। যদিও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বাড়ির কাছে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, তবুও তারা নতুন হামলার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। এ ঘটনায় হত্যাচেষ্টা, অপরাধমূলক ভয়ভীতি প্রদর্শন, নারীর শ্লীলতাহানি ও ডাকাতির অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ।

ভুক্তভোগীদের একজন ৪০ বছর বয়সী নারী। পেশায় তামা ও ধাতব গয়না প্রস্তুতকারক ওই পরিবারের ওপর চলা নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে তিনি জানান, গত ১৮ অক্টোবর বেলা সাড়ে তিনটার দিকে একদল দুর্বৃত্ত তাদের বাড়িতে চড়াও হয়।

তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে ও আমার স্বামীকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে বের করে মারধর করে। মাটিতে ফেলে আমার কাপড় ছিঁড়ে ফেলা হয়। এরপর আমাকে তুলসীপাতা ও বেলপাতা খেতে বাধ্য করা হয় এবং শুদ্ধীকরণের আচার হিসেবে গায়ে পানি ঢালা হয়। সবাই দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিল।’

হামলাকারীরা ওই পরিবারগুলোর সদস্যদের খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ করার জন্যও চাপ সৃষ্টি করে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

প্রথম দফায় হামলার পর দুর্বৃত্তরা প্রতিবেশী আরও দুটি খ্রিষ্টান পরিবারের বাড়িতে ঢুকে সদস্যদের মারধর করে এবং নগদ ২০ হাজার রুপি লুট করে নিয়ে যায়। একই সঙ্গে পুলিশে অভিযোগ না করার জন্য হুমকি দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগী নারী আরও জানান, তারা ১০০ নম্বরে ফোন করে পুলিশের সহায়তা চান। পুলিশ এসে কথা শুনে চলে গেলেও ১৯ অক্টোবর সকালে হামলাকারীরা পুনরায় ফিরে আসে। পুলিশকে জানানোর কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে তারা ওই পরিবারগুলোকে পাশের একটি গ্রামের দুর্গাপূজার মণ্ডপে জোর করে নিয়ে যায় এবং অঞ্জলি দিতে বাধ্য করে। এছাড়া প্রতিবেশী অন্য দুই খ্রিষ্টান পরিবারের এক অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকেও মারধর করা হয়।

পরদিন ২০ অক্টোবর তিন পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ধরে নিয়ে গিয়ে হুমকি দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী নারী বলেন, ‘তারা বাড়ি ফিরে কাঁদছিলেন। তিনদিন আমাদের ওপর দিয়ে ভয়াবহ গেছে। ভয়ে তিন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দিই। পরে সম্প্রদায়ের লোকজনের পরামর্শে থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করা হয় এবং পুলিশ এসে আমাদের হাসপাতালে নিয়ে যায়।’

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে আইনি সহায়তা প্রদানকারী কলকাতা হাইকোর্টের এক আইনজীবী জানান, ২০ অক্টোবর তিনি থানায় যাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত এফআইআর নথিভুক্ত করে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা না হওয়ায় পরিবারগুলো আতঙ্কে রয়েছে।

পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা জানিয়েছেন, ঘটনার তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, ‘তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন, তাই আমরা তাদের বাড়িতে গিয়ে থানায় নিয়ে আসি এবং অভিযোগ গ্রহণ করি। তারা বাড়ি ফিরে যেতে চাওয়ায় তাদের বাড়ির কাছে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের সুরক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

বর্তমানে বাড়ির বাইরে পুলিশ পাহারা থাকলেও, পরিবারের বৃদ্ধ ও অসুস্থ সদস্যদের নিয়ে ভবিষ্যৎ সুরক্ষার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।

ইত্তেফাক/এএম