সম্প্রতি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) প্রকাশিত 'এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্ট ২০২৬' শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের যে চিত্র তুলিয়া ধরা হইয়াছে তাহা উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ১ কোটি ৩৩ লক্ষ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হইতে পারে। ক্রমান্বয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় প্লাবন, সুপেয় পানির তীব্র সংকট ও কৃষি খাতের মারাত্মক বিপর্যয় আমাদের লক্ষ লক্ষ দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকাকে ঠেলিয়া দিতেছে অনিশ্চয়তার মুখে। যদি এখনই যথোপযুক্ত ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহা হইলে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর গৃহ ও সম্বলহীন হইয়া পড়িবার আশঙ্কা সর্বাধিক।
বাংলাদেশ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করিয়া টিকিয়া রহিয়াছে। প্রাথমিক সতর্কবার্তা প্রদান ও বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে জানমালের রক্ষায় যেই সক্ষমতা অর্জন করিয়াছে, তাহা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসনীয়; কিন্তু কেবল আশ্রয়কেন্দ্র দিয়া আসন্ন মহাবিপর্যয় কতটা ঠেকানো যাইবে, তাহা লইয়া সংশয় রহিয়াছে। বিশেষ করিয়া উপকূলীয় এলাকার মানুষের সুরক্ষায় দূরদর্শী ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের এখনই সময়। এই ব্যাপারে অবহেলা প্রদর্শন করিলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়িবে বই কমিবে না। এই জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও তাহার বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। প্রথমত এক হইতে তিন বৎসরব্যাপী স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে থাকিতে পারে উপকূলীয় এলাকার চরম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল চিহ্নিত ও স্থানীয় পর্যায়ে খাপ খাইয়া নেওয়ার (Local Adaptation) সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এই জন্য ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রসমূহের আধুনিকীকরণ ও নূতন কেন্দ্র নির্মাণ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। উপকূলবর্তী দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগণের জন্য সুপেয় পানির সংকট নিরসনে লোনা পানি শোধনাগার স্থাপন এবং জরুরি খাদ্য ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা আবশ্যক। ইহার পাশাপাশি আবহাওয়া পূর্বাভাসের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করিয়া সাধারণ মানুষের নিকট দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছাইবার ব্যবস্থা করিতে হইবে।
দ্বিতীয়ত, তিন হইতে ১০ বৎসরব্যাপী মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে থাকিতে পারে উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক ঢাল ও সুরক্ষাবলয় গড়িয়া তোলা ও প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার প্রদান করা। এই জন্য ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ ও নূতন করিয়া সুন্দরবনসহ উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা জরুরি। জলবায়ুসহিষ্ণু কৃষি প্রযুক্তি ও লবণাক্ততাসহিষ্ণু ফসলের বীজ উদ্ভাবন এবং কৃষকদের মাঝে তাহা দ্রুত ছড়াইয়া দেওয়ার বন্দোবস্ত করা আবশ্যক। ইহার মাধ্যমে কৃষি বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব। ইহা ছাড়া বেড়িবাঁধসমূহের উচ্চতা বৃদ্ধি, পুনর্নির্মাণ ও নিয়মিত সংস্কারের মাধ্যমে উপকূলীয় প্লাবন রোধ করিতে হইবে। বাস্তুচ্যুত সম্ভাব্য জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের অবকাঠামো গড়িয়া তোলাও একান্ত প্রয়োজন। তৃতীয়ত, ১০ হইতে ৩০/৫০ বৎসরব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনের জন্য টিকসই 'জলবায়ু অভিবাসন-নীতি' ও মেগা নগরায়ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করিতে হইবে। রাজধানী ও প্রধান শহরসমূহের উপর চাপ কমাইতে উপকূলবর্তী নিরাপদ স্থানে সমন্বিত ও পরিবেশবান্ধব নূতন উপশহর গড়িয়া তোলা দরকার। নদীর অববাহিকা ব্যবস্থাপনা, ডেলটা প্ল্যান ২১০০-এর যথাযথ বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল (Climate Financing) হইতে ন্যায্য অর্থপ্রাপ্তি নিশ্চিতকরণেও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করিতে হইবে।
প্রকৃতি সৃষ্টিকর্তার অমূল্য দান; কিন্তু একের পর এক বিরূপ আচরণ ও বাড়াবাড়ি করিবার মাধ্যমে মানুষ জলে-স্থলে ও অন্তরীক্ষে বিপর্যয় ডাকিয়া আনিতেছে। এই জন্য সর্বত্র প্রকৃতির সহিত সহাবস্থানকে গুরুত্ব না দেওয়া হইলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করা অসম্ভব। এখন উন্নত কি উন্নয়নশীল সকল দেশই কমবেশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির মুখে পড়িয়াছে। তবু বিশ্বনেতাদের শুভবুদ্ধির উদয় হইতেছে বলিয়া প্রতীয়মান হয় না। তবে প্রকৃতির সহিত আমরা সঠিক আচরণ এবং সুনির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা গ্রহণ করিলে ক্ষয়ক্ষতি বহুলংশে হ্রাস করা অসম্ভব নহে। এডিবির এই উপলব্ধি যথার্থ যে, আজকের সঠিক বিনিয়োগই আগামী দিনের ধ্বংসলীলা হইতে আমাদের রক্ষা করিতে পারে। অতএব, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বয়ে আমাদের ত্রিস্তরীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হইতে হইবে।
