কক্সবাজারে ১০ পর্যটকের মৃত্যু

রিসোর্টে আগুনের যে কারণ জানাল পুলিশ-তদন্ত কমিটি

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৪১

কক্সবাজারের উখিয়ায় টুপটুপ রিসোর্টে আগুনের সূত্রপাত বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ ও তদন্ত কমিটি। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিচতলার একটি ফ্রিজে শর্টসার্কিটের পর রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে। রিসোর্টের গুদামে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গত ১৭ অক্টোবর শনিবার সকালে উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন মেরিন ড্রাইভের পাশে তিনতলা রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। এ ঘটনায় ১০ পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত রিসোর্টটির দোতলা ও তিনতলার আটটি কক্ষে পর্যটকেরা ছিলেন। নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ ও কর্মীদের থাকার ব্যবস্থা।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, গ্রেপ্তার সহকারী ব্যবস্থাপককে জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিচতলার একটি ফ্রিজে প্রথমে শর্টসার্কিট হয়। সেখান থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে। গুদামে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ থাকার পাশাপাশি তীব্র বাতাস ও কাঠের অবকাঠামোর কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সেখানে কী ধরনের রাসায়নিক পদার্থ মজুত ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রিমন ঘোষ বলেন, আগুনের সূত্রপাত নিয়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে আরও তদন্ত প্রয়োজন।

ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটিও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগা এবং পরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের বিষয়টি সামনে এসেছে। বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।

রিসোর্টের পাশের চা-কফির দোকানের মালিক গিয়াস উদ্দিন জানান, ঘটনার সকালে বিকট শব্দ শুনে বাইরে এসে তিনি রিসোর্টে আগুন জ্বলতে দেখেন। সে সময় সেখানে লোকজন ছোটাছুটি করছিলেন। আগুনে তার দোকানের একটি ফ্রিজ ও কাঠের কিছু অংশও পুড়ে যায়। জালিয়াপালং ইউনিয়নের আনসার-ভিডিপি কমান্ডার মোহাম্মদ আজিজও বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন। তবে শব্দটির উৎস তারা নিশ্চিত করতে পারেননি।

প্রায় ২০ শতক জমির ওপর নির্মিত রিসোর্টটির কক্ষের মেঝে, দেয়াল ও সিঁড়ির বড় অংশ কাঠের তৈরি ছিল। সড়কের পাশে গাছের খুঁটির ওপর রেস্তোরাঁর বর্ধিত অংশও নির্মাণ করা হয়েছিল। আগুনে এসব কাঠের অবকাঠামো পুড়ে যায়।

শুধু ট্রেড লাইসেন্সে চলছিল ব্যবসা
টুপটুপ রিসোর্টের ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছিল জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের দেওয়া ট্রেড লাইসেন্সের ভিত্তিতে। গত ২২ জুলাই রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়ার নামে লাইসেন্সটি ইস্যু করা হয়। এতে তার ঠিকানা চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর মীরপাড়া উল্লেখ রয়েছে।

লাইসেন্সটির মেয়াদ চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত। লাইসেন্স ফি ৫০০ টাকা, মূল্য সংযোজন কর ৭৫ টাকা ও বাণিজ্যিক কর ১ হাজার ৪২৫ টাকাসহ মোট ২ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল।

জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম ছৈয়দ আলম বলেন, ইউনিয়ন এলাকায় ব্যবসা পরিচালনার জন্য নির্ধারিত ফি নিয়ে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়। টুপটুপ রিসোর্টের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের পর জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল না।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টের মালিক ও মামলার প্রধান আসামি তানভীর সুলতান মিয়া পলাতক রয়েছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তিনি বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থান করছেন। রিসোর্টের আরেক মালিক নেওয়াজ মোরশেদসহ অন্যরাও আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। তবে রিমান্ড শুনানি এখনো অনুষ্ঠিত হয়নি।

অতিথির সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য
অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টে ঠিক কতজন পর্যটক ছিলেন, তা নিয়ে স্বজনদের বক্তব্য ও পুলিশের হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। স্বজনদের দাবি, ১৬ অক্টোবর শুক্রবার রাতে নারী ও শিশুসহ সেখানে ২১ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। পরদিন শনিবার ভোরে আইরিন জাহান ও ইসরাত জাহান সৈকতে বেড়াতে যাওয়ায় রিসোর্টে ছিলেন ১৯ জন।

পোষা প্রাণীর সঙ্গে রিসোর্টের মালিক মো. তানভীর সুলতান মিয়া

স্বজনদের হিসাব অনুযায়ী, তাদের মধ্যে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, ছয়জন আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন এবং দুজন লাফ দিয়ে প্রাণে বাঁচেন। তাদের দাবি, এরপরও একজনের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

তবে ওসি আতিকুর রহমান বলেন, প্রাথমিক তদন্ত এবং গ্রেপ্তার সহকারী ব্যবস্থাপকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার সময় আটটি কক্ষে ১৯ জন অতিথি ছিলেন। তাদের মধ্যে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সাতজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং দুজন লাফ দিয়ে রক্ষা পেয়েছেন। এই ১৯ জনের বাইরে আর কেউ নিখোঁজ রয়েছেন, এমন তথ্য তদন্তে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে লিখিত দাবিও আসেনি।

জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, ১০টি মরদেহ উদ্ধারের পর আরও একজন নিখোঁজ থাকার বিষয়টি সামনে আসে। পরে ফায়ার সার্ভিস আবারও তল্লাশি চালালেও কোনো মরদেহ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ইত্তেফাক/এসজেএস