ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু থাকার শঙ্কা

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০০

দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত এডিস মশার ঘনত্ব সহনীয় পর্যায় অর্থাত্ নিয়ন্ত্রণে না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আসবে না বলে জানিয়েছেন কীটতত্ত্ববিদরা। তাদের মতে, গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলেছে। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম মহানগরসহ বিভাগীয় শহরের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের সংখ্যা সর্বাধিক বলে কীটতত্ত্ববিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

অপরদিকে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের চিকিত্সা সেবা সামাল দিতে গিয়ে সরকারি হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে অন্যান্য রোগীদের চিকিত্সা ও অপারেশন ব্যাহত হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর একাধিক কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে। একজন স্বনামধন্য শল্যবিদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘বেশ কয়েকজন জটিল রোগীর অপারেশন করা জরুরি। কিন্তু আইসিইউ সংকট থাকায় অপারেশন করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি বেসরকারি পর্যায় আইসিইউগুলোর মধ্যে সিংহভাগ বেডে ডেঙ্গু রোগী। জটিল রোগী অপারেশন করার আগে ্আইসিইউ প্রস্তুত রাখতে হয়। ডেঙ্গু রোগীর ব্যাপক চাপের কারণে সরকারি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চাপ পড়েছে বলে উক্ত শল্যবিদ জানিয়েছেন।

একটি চিহ্নিত মশা কামড়ালে ডেঙ্গু জ্বর হয়। এডিস মশা বংশ বিস্তার নিধন বা ধ্বংস করলে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কোথায় বংশবিস্তার করে—এটা সকলের জানা। তারপরেও নিধন করার জন্য উদ্যোগ নেয় না। শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাসা কিংবা বাড়িতে আশপাশে জমাট বাধা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা বংশ বিস্তার করে। বাসিন্দারা সচেতন হলে নিজেরাই উত্সস্থল নিজেরাই ধ্বংস করতে পারে। এই কাজ করলে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারবে না। ডেঙ্গু জ্বরও হবে না বলে ঐ কীটতত্ত্ববিদ জানান।

এদিকে, হামের টিকা ৯৫ ভাগ শিশুকে দিতে পারলে তা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছতে এখনো বাকি রয়েছে। তবে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাপকহারে চলছে বলে এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তবে হাম ছোঁয়াচে। হামে এক জন আক্রান্ত হলে অপর জনের হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ডেঙ্গু জ্বর ছোঁয়াচে নয়, শুধু এডিস মশা কামড়ালে ডেঙ্গু জ্বর হয়। এই বিষয়টি চিহ্নিত ও সকলের জানা। কিন্তু মশক নিধনে সক্রিয় ভূমিকা পালনের ব্যর্থতা ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়ায় বলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের অভিমত।

গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ২৯৯ জন। গত পহেলা জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত ১১ লাখ ৯ হাজার ৮০১ জন আক্রান্ত হন এবং মারা গেছে ৩৭১ জন।  গত ২৪ ঘণ্টায় হামে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৯১০ জন। এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ২১ লাখ ৮ হাজার ৮৭০ জন এবং মারা গেছে ১ হাজার ১১০ জন।

মহাখালী জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিত্সা প্রতিষ্ঠানের বিভাগীয় প্রধান কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. গোলাম ছারোয়ার বলেন, ‘ডেঙ্গু যখন দেশে শুরু হয়েছে তখন এটা নির্মূল করা সম্ভব। শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না, সকল বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতন থাকতে হবে। পাশাপাশি সরকারের যেসব প্রতিষ্ঠানের মশক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব রয়েছে ঐসব প্রতিষ্ঠানকে মশক নিধনে দেশব্যাপী ক্রাশ প্রোগ্রাম ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।’ ডেঙ্গু এখন গ্রামে ঢুকে পড়েছে, ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে গ্রামের সংখ্যা সর্বাধিক বলে তিনি জানান।  জনস্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘প্রথমে ডেঙ্গু জ্বর শুরু হয় রাজধানীতে। ২৬ বছর আগেকার ঘটনা। এ পর্যন্ত আমরা ডেঙ্গুর সঙ্গে বসবাস করছি। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গু ব্যাপকহারে শুরু হয়েছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার গ্রামাঞ্চলে বেশি। ডেঙ্গু জ্বরে চিকিত্সা সেবা ও পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যবস্থায়ও ঘাটতি রয়েছে অনেক। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সংকট অনেক। চিহ্নিত এডিস মশা কামড়ালে ডেঙ্গু হয়। এই মশা নিধন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নাই। শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সকল স্তরের লোকজনের অংশগ্রহণে সমন্বিত ক্রাশ প্রোগ্রাম থাকতে হবে।’ সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মশক নিধন কার্যক্রম চালিয়ে গেলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব বলে তিনি জানান।

অতি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজিমপুর সরকারি আবাসিক এলাকায় গিয়ে ময়লা-আবর্জনা দেখতে পান। ঐ এলাকায় সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা বসবাস করেন। ঐদিন সিটি করপোরেশনসহ সরকারের অন্যান্য বিভাগ মিলে এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাতচন্দ্র বিশ্বাস জানান, ডেঙ্গু ও হাম নিয়ন্ত্রণে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। হাম জাতীয় কার্যক্রম ও ক্যাম্পেইন যখন শুরু হয়। প্রথম দিকে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়। পাশাপাশি ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। ঐ সময় হামের টিকার বাইরে থেকে যায় কিছু শিশু। তাদের মধ্যে হামে আক্রান্ত হয়। এ বিষয়টি তাদের নজরে আসার পরপরই বাড়ি বাড়ি খুঁজে বাদ পড়া শিশুদের টিকা দেওয়া শুরু হয়। এ পর্যন্ত ২ কোটি ১২ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে হামের টিকা দেওয়ার টার্গেট পূরণ হয়ে যাবে। এই টিকা দেওয়া চলমান থাকবে। একটি শিশুও টিকার বাইরে থাকবে না বলে তিনি জানান।

ইত্তেফাক/এএম