৭৫ বছর ছাঁটাই ছাড়াই চলছে কোম্পানিটি, পরিচালনা পদ্ধতি দেখতে ভিড় সিইওদের

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৫

ব্যবসায় মন্দা, আয় কমে যাওয়া কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ার কারণে বিশ্বজুড়ে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করছে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান দ্য গান্ড কোম্পানি টানা ৭৫ বছর ধরে কোনো কর্মী ছাঁটাই না করেই ব্যবসা পরিচালনা করছে। কর্মীদের ধরে রেখে কীভাবে প্রবৃদ্ধি ও মুনাফা বাড়ানো সম্ভব, তা জানতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি দেখতে ছুটছেন বিভিন্ন কোম্পানির প্রধান নির্বাহী ও শীর্ষ কর্মকর্তারা।

১৯৫১ সালে সাবেক ক্যান্ডি বিক্রেতা এড গান্ডের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে পারিবারিক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানটি। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইসে কার্যক্রম পরিচালনাকারী এ কোম্পানির সাফল্য এখন ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনার আলোচনায় উঠে এসেছে।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে রয়েছেন পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি ৫৫ বছর বয়সী স্টিভ গান্ড। তিনি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার বড় ভাই রিচ গান্ড কোম্পানির চেয়ারম্যান ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কর্মী নিয়ে পরিচালিত গান্ড কোম্পানির বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ প্রায় ৪০ কোটি ডলার। জেনারেল ইলেকট্রিক ও রকওয়েল অটোমেশনের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য বৈদ্যুতিক উপকরণ সরবরাহ করে আসছে তারা। গত এক দশকে কোম্পানিটির গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ শতাংশ। একই সময়ে মুনাফার হারও হয়েছে দ্বিগুণ।

স্টিভ গান্ডের ভাষায়, বিষয়টি শুনতে আবেগনির্ভর মনে হলেও কর্মীদের ছাঁটাই না করার নীতি ব্যবসার জন্য লাভজনক।

অর্থনৈতিক মন্দার সময় কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানটি সারা বছর তুলনামূলক সীমিতসংখ্যক কর্মী নিয়ে কাজ করে। পাশাপাশি উৎপাদন ও ব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে অনুসরণ করে ১২ ধাপের ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা। এর আওতায় কারখানার দেয়ালে আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করা হয়, কর্মীদের ব্যক্তিগত কর্মজীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা দেওয়া হয় এবং সুপারভাইজারদের নিয়মিত উৎপাদনস্থলে উপস্থিত থাকতে হয়।

কারখানার কর্মীরা কাজের সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান জানাতে লাল কার্ড ব্যবহার করেন। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সমস্যার সমাধান না করা পর্যন্ত কার্ডটি দৃশ্যমান স্থানে রাখা হয়। কর্মীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার এই ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠানের পরিচালন পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

স্টিভ গান্ড বলেন, কর্মীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলে তারা নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। আর সেই মতামতের ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে।

প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসেও কর্মী ছাঁটাই না করার নীতির দীর্ঘ প্রভাব রয়েছে। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে স্টিভ ও রিচ গান্ড পূর্ণকালীন কর্মী হিসেবে যোগ দেওয়ার সময় কোম্পানির বার্ষিক বিক্রি ছিল মাত্র ২৭ লাখ ডলার। তখন কর্মী ছিলেন ২০ জন, যাদের মধ্যে নয়জনই ছিলেন গান্ড পরিবারের সদস্য।

পরিবারের আগের প্রজন্মের সদস্য পল গান্ড কর্মী ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তার দৃষ্টিতে, কর্মীর সংখ্যা কমিয়ে আনা ছিল নির্বাহী ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার লক্ষণ। পরবর্তী সময়ে এই নীতির সঙ্গে কর্মীদের প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় অংশীদার করার উদ্যোগও যুক্ত হয়।

২০০৯ সালে কোম্পানিটি কর্মীদের জন্য শেয়ার মালিকানা পরিকল্পনা চালু করে। গত বছর নাগাদ এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের কর্মীদের হাতে প্রতিষ্ঠানের ৩০ শতাংশ শেয়ার ছিল। কর্মীদের অংশীদারত্বের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ পদোন্নতিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেয় প্রতিষ্ঠানটি। বাইরে থেকে নতুন কর্মী নিয়োগের বদলে বিদ্যমান কর্মীদের দক্ষতা বাড়িয়ে দায়িত্বশীল পদে উন্নীত করার চেষ্টা করা হয়।

এর উদাহরণ ডেইড্রা জোনাস। ৩৩ বছর বয়সী এই কর্মী ১৬ বছর আগে শিক্ষানবিশ পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি পেয়ে তিনি মেশিন পরিচালনা, অভ্যর্থনা ও গ্রাহকসেবার দায়িত্ব পান। পাশাপাশি কর্মীদের মতামত শোনার অধিবেশনও পরিচালনা করেন। জোনাস বলেন, তার বর্তমান স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা নিয়ে তার পরিবারের কেউ আগে ভাবেননি।

কর্মীদের জীবনমান ও আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব পায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারখানার একজন শিক্ষানবিশ কর্মী ওভারটাইম ও মুনাফা ভাগাভাগির অর্থ বাদ দিয়েই বছরে গড়ে ৫৫ হাজার থেকে ৬৫ হাজার ডলার আয় করতে পারেন। বিভিন্ন পদের বেতনকাঠামো কর্মীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাবও প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা হয়।

কর্মী ছাঁটাই না করার এই মডেল দেখতে ইতোমধ্যে ২০০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের নেতারা গান্ড কোম্পানির কারখানা পরিদর্শন করেছেন। ওহাইওভিত্তিক ওয়েল্টি এন্টারপ্রাইজেসের প্রধান নির্বাহী ডন টেলর তার ছেলে মাইকেলকে নিয়ে উইসকনসিনে কোম্পানিটির একটি কারখানা ঘুরে দেখেন। ডন টেলর বলেন, গান্ডের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির কিছু অংশ নিজেদের প্রতিষ্ঠানে প্রয়োগ করতে পারলে তা উপকারী হতে পারে।

তবে পরিদর্শনে আসা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই গান্ডের পুরো ১২ ধাপের পরিকল্পনা অনুসরণ করছে না বলে জানিয়েছেন স্টিভ গান্ড। তার মতে, অনেক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা নিজেরা পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ার বদলে মানবসম্পদ বিভাগের ওপর সেই দায়িত্ব ছেড়ে দেন।

বিশ্লেষকদের মতে, গান্ডের সাফল্যকে শুধু কর্মীবান্ধব নীতির ফল হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। এর পেছনে রয়েছে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং বাজারের চাহিদার সঙ্গে উৎপাদন সমন্বয়ের কৌশল। চাহিদা বেশি থাকার সময় অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ না করে ওভারটাইমের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো হয়। আবার চাহিদা কমলে ওভারটাইম কমানো এবং নতুন নিয়োগ স্থগিত রেখে শ্রমঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। কর্মীদের স্বাভাবিকভাবে চাকরি ছেড়ে যাওয়ার প্রবণতাও এ ক্ষেত্রে নমনীয়তা তৈরি করে।

কর্মী ছাঁটাই না করার নীতি অনুসরণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে লিংকন ইলেকট্রিক, নিউকোর ও ব্যারি-ওয়েহমিলারের নামও উল্লেখ করা হয়। তবে ২০০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময় বিক্রি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে যাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের কিছু ক্ষেত্রে অবৈতনিক ছুটি কিংবা কর্মঘণ্টা কমানোর মতো পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল। অন্যদিকে, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের চাহিদা ও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারায় গান্ড তুলনামূলক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পেরেছে।

তবে প্রতিষ্ঠানটির সামনে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক ব্যবস্থাপনা বৈঠকে কর্মীদের মধ্যে অতিরিক্ত সময় কাজ করার আগ্রহ কমে আসার বিষয়টি উঠে এসেছে। চাহিদা বাড়ার সময় ওভারটাইমের ওপর নির্ভর করা না গেলে নতুন কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে, যা উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করবে।

দ্রুত ব্যবসা সম্প্রসারণের কারণে দক্ষ ব্যবস্থাপক ও সুপারভাইজার তৈরির গতিও চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। এ ছাড়া চীনসহ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের আটটি আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে একই কর্মীনীতি ও শেয়ার মালিকানা পরিকল্পনা কার্যকর করাও আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।

বিশ্ববাজারে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার ও বিদ্যুৎ গ্রিডের সরঞ্জামের চাহিদা বজায় থাকলে গান্ডের বর্তমান মডেল কার্যকর রাখা সহজ হতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে চাহিদা হঠাৎ কমে গেলে কর্মী ছাঁটাই না করেই প্রতিষ্ঠানটি কতটা স্থিতিশীল থাকতে পারে, সেটিই হবে তাদের দীর্ঘদিনের নীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

 
ইত্তেফাক/এসজেএস