মার্কিন কর্মকর্তাদের হত্যার গোপন মিশনের ‘চূড়ান্ত পর্যায়ে’ ইরান, সতর্ক ওয়াশিংটন

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৪

মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে প্রাণঘাতী হামলার পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে ইরান—এমন গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর সতর্কতা জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের কয়েকটি অঞ্চলে মার্কিন সরকারি কর্মীদের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন দূতাবাস ও কনস্যুলেটে কর্মীসংখ্যা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) মার্কিন কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক জে ক্লেটন গত শুক্রবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাঠানো এক স্মারকলিপিতে সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে সতর্ক করেন। এতে বলা হয়, মার্কিন কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করার তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে মার্কিন নাগরিকদের হত্যার উদ্দেশ্যে হামলার পরিকল্পনা অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে বলে গোয়েন্দা তথ্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

শুক্রবার রাতে ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা স্মারকলিপির বিষয়বস্তু নিশ্চিত করেন। এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও অন্য কয়েকটি অঞ্চলে মার্কিন নাগরিকদের ওপর হামলার হুমকি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার জ্যেষ্ঠ সহযোগীদের নিয়মিতভাবে হুমকির বিষয়ে অবহিত করা হচ্ছে। গত তিন সপ্তাহ ধরে গোয়েন্দা বিশ্লেষকেরা বিভিন্ন দেশে কর্মরত মার্কিন কর্মকর্তাদের, বিশেষ করে রাষ্ট্রদূতদের লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হামলার তথ্য পর্যালোচনা করছেন। কিছু গোয়েন্দা তথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইরানি এজেন্টদের উপস্থিতির সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। ইউরোপের কয়েকটি স্থানও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

তবে অন্য এক মার্কিন কর্মকর্তা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা সীমিত। হামলার পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়নের সামর্থ্য তুলনামূলকভাবে কম বলে তার মূল্যায়ন। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস, জে ক্লেটনের দপ্তর ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ কোনো মন্তব্য করেনি।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন তথ্য পাওয়ার পর বিভিন্ন দেশে কূটনৈতিক মিশনে কর্মী মোতায়েনের বিষয়টি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়। ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর সম্ভাব্য হামলা এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইরানের হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে পাওয়া তথ্য কর্মীসংখ্যা সমন্বয়ের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশনগুলো আগে থেকেই সীমিত কার্যক্রমের আওতায় রয়েছে। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় সাধারণত এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী দূতাবাস ও কনস্যুলেটের কর্মীসংখ্যা পরিবর্তন করা যায়।

রুবিও ও ট্রাম্প

যুদ্ধের আট মাস পর নতুন হামলার আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের আট মাস পেরিয়ে গেছে। এ সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানির দাম বেড়েছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের জনসমর্থনও কমেছে। গত বুধবার দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তবে এ বিষয়ে ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।

গত কয়েক মাসে ইরানে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া থেকে বিরত রয়েছেন ট্রাম্প। তবে দেশটির তেলসহ অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক বিক্রি বন্ধ করার উদ্দেশ্যে ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলার বিভিন্ন পথ খুঁজছে ইরান। অক্টোবরে ইরানের সম্ভাব্য হামলার হুমকি নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর দক্ষিণ ইংল্যান্ডের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর ১২টি বি-১ বোমারু বিমান সরিয়ে নেওয়া হয়। ওই ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলার আশঙ্কা সম্পর্কে সামরিক কমান্ডাররা তথ্য পেয়েছিলেন বলে জানান কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, একসঙ্গে এতগুলো বোমারু বিমান সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ছিল নজিরবিহীন। ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস

গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ
মার্কো রুবিওকে পাঠানো স্মারকলিপিতে জে ক্লেটন জানান, সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে আরও বেশি সরকারি কর্মীকে সতর্ক করতে কিছু গোয়েন্দা তথ্যের গোপনীয়তার স্তর কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্মারকলিপিতে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী হামলার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারের সংশ্লিষ্ট আরও বেশি কর্মীর কাছে হুমকির তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে ইরানের সামরিক বাহিনী। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি আরব দেশ ও ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২ মার্চ ইরাক, জর্ডান ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলো থেকে অপ্রয়োজনীয় কর্মীদের বাধ্যতামূলকভাবে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।

প্রায় একই সময়ে সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলো থেকেও অপ্রয়োজনীয় কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের চলে যেতে বলা হয়। রিয়াদে মার্কিন দূতাবাস ও এর আশপাশের এলাকায় ইরানের হামলার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে কর্মকর্তারা জানান।

যুদ্ধ শুরুর আগে বৈরুত ও জেরুজালেমে অবস্থিত দুটি মার্কিন দূতাবাসের কর্মীদের স্বেচ্ছায় কর্মস্থল ত্যাগের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ‘অথরাইজড ডিপারচার’ নামে পরিচিত এ ব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয় কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা চাইলে নিজ উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট এলাকা ছেড়ে যেতে পারেন। বৈরুতের দূতাবাস যুদ্ধ শুরুর চার দিন আগে এবং জেরুজালেমের দূতাবাস এক দিন আগে এ অনুমতি দেয়।

চলতি গ্রীষ্মে সংঘাতের তীব্রতা সাময়িকভাবে কমে এলে কয়েকজন মার্কিন কূটনীতিককে আবারও তাদের কর্মস্থলে ফেরার অনুমতি দেয় পররাষ্ট্র দপ্তর। তবে নতুন গোয়েন্দা তথ্যের পর বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন কর্মকর্তা ও কূটনৈতিক মিশনগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আবারও বেড়েছে।

ইত্তেফাক/এসজেএস