জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক আসন্ন ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) পাঠ্যবইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসাবে মানুষের মস্তিষ্কের ছবির পরিবর্তে একটি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধিত নির্বাচনি প্রতীক ব্যবহারের অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহাকে কেবল একটি মুদ্রণগত বা কারিগরি ত্রুটি বলিয়া এড়াইয়া যাওয়ার সুযোগ আছে বলিয়া আমরা মনে করি না। কেননা এই সামান্য ভুলের মাশুলস্বরূপ সমগ্র দেশ হইতে মাঠপর্যায়ে প্রেরিত প্রায় ৩০ লক্ষ বই প্রত্যাহার করিয়া পুনরায় ছাপাইতে নির্দেশ দিয়াছে এনসিটিবি। আর ইহাতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১৭ কোটি টাকা গচ্ছা যাইতেছে। সরকারের নির্দেশে নূতন করিয়া বই ছাপানো হইতেছে বটে; কিন্তু প্রশ্ন হইল, ইহার জন্য যে বা যাহারা দায়ী তাহাদের কি কোনো শাস্তি হইবে না? সরকারি অর্থ অপচয়ের জন্য অবশ্যই তাহাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় বা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
একটি উন্নয়নশীল দেশের বাজেট সীমিত। তাই বাজেটের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা একান্ত কাম্য; কিন্তু এই ক্ষেত্রে যে অহেতুক আর্থিক ক্ষতি ও সময়ক্ষেপণ হইয়াছে তাহা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। জানা যায়, আলোচ্য বইটির 'উপাত্ত ও তথ্য' অধ্যায়ে জ্ঞানের পিরামিডের চারটি স্তর-উপাত্ত, তথ্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দেখানো হইয়াছে। ইহাতে পিরামিডের সর্বোচ্চ স্তর বা 'প্রজ্ঞা' বুঝাইতে পূর্বে মানুষের মস্তিষ্কের ছবি রাখা হইলেও সাম্প্রতিক সংস্করণে সেইখানে একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি প্রতীক বা দাঁড়িপাল্লার ছবি যুক্ত করা হয়। পাঠ্যপুস্তকের মতো একটি পবিত্র ও সর্বজনগ্রাহ্য জাতীয় দলিলে এই ধরনের প্রতীক অন্তর্ভুক্তির ফলে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষাঙ্গনে তীব্র বিতর্ক ও বই প্রণয়ন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা লইয়া দেখা দিয়াছে প্রশ্ন। যদিও এনসিটিবির পক্ষ হইতে ইহাকে পূর্বের বৎসরের পুরাতন নকশা ভুলক্রমে পুনরায় যুক্ত হওয়ার ফল বলিয়া দাবি করা হইয়াছে, তবু প্রশ্ন জাগে-দায়িত্বশীল একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে এই ধরনের সংবেদনশীল ভুল কীভাবে বারংবার সংঘটিত হয়? কেননা পাঠ্যপুস্তকে এমন ভুল বা বিতর্কিত বিষয়ের অবতারণা ইহাই প্রথম নহে। শিক্ষাবিদদের মতে, পাঠ্যপুস্তকে রাজনৈতিক প্রতীক বা প্রচ্ছায়ার উপস্থিতি শিক্ষার্থীদের কোমল মনে কোনো বিশেষ আদর্শ বা মতাদর্শ চাপাইয়া দেওয়ার শামিল, যাহা শিক্ষার মূল লক্ষ্য ও বস্তুনিষ্ঠতাকে দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ করে। এই জন্য আজিকার এই পরিস্থিতিতে কেবল ভুল সংশোধন করিয়াই দায়িত্ব শেষ করিলে চলিবে না; বরং এই ঘটনার পশ্চাতে কোনো অসাবধানতা নাকি সুদূরপ্রসারী অবহেলার যোগসূত্র রহিয়াছে, তাহার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া আবশ্যক। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মাঠপর্যায় হইতে বইগুলি ফেরত আনিয়া সেইগুলিতে মস্তিষ্কের ছবি যুক্ত করিয়া পুনরায় শিক্ষার্থীদের হাতে সঠিক সময়ে পৌঁছাইয়া দেওয়া এনসিটিবির নিকট এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হইয়া দাঁড়াইয়াছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যাইতে পারে, সকল শ্রেণি মিলাইয়া আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপানো হইতেছে। ইহাতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হইয়াছে প্রায় ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার পর্যন্ত বাঁধাই, কাটিং ও প্রাক-সরবরাহ পরিদর্শন (পিডিআই) শেষে সরবরাহ করা হইয়াছে ৭৬ শতাংশ বই। অন্যদিকে প্রথম দফায় দরপত্র হওয়া মাধ্যমিক স্তরের ২০ কোটি ৮৪ লক্ষাধিক বইয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ ছাপার কাজ শেষ হইয়াছে। ইতিমধ্যে চলতি বৎসরের মধ্যে মাঠপর্যায়ের সকল বই পৌঁছাইয়া দেওয়ার অঙ্গীকার করিয়াছে সরকার। উপরিউক্ত ত্রুটিবিচ্যুতির পর সেই কাঙ্ক্ষিত সময়ে কি বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাইবে? যে যাহাই বলুন না কেন, প্রাষ্প্রাথমিক হইতে শুরু করিয়া মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত কোটি কোটি বই মুদ্রণের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে উপরিউক্ত প্রকৃতির ভুল প্রশাসনের কড়া নজরদারির অভাবকেই স্পষ্টভাবে তুলিয়া ধরে। তাই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে ভবিষ্যতে পাঠ্যবই প্রণয়ন, সম্পাদনা ও প্রচ্ছদ নকশার প্রতিটি ধাপে অধিকতর সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হইবে। শিক্ষাক্রম যেন কোনোভাবেই দলীয় সংকীর্ণতা কিংবা অনভিপ্রেত বিতর্কের শিকার না হয়, সেই বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট সকল মহলের সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সচেতনতা কামনা করি।
