নাটোরে সন্ত্রাসী হামলায় আহত ছাত্রদল নেতা শাকিল মারা গেছেন

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৭

হেলমেটধারী সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের বর্বরোচিত গুলি ও কোপের শিকার হয়ে দীর্ঘ ১২ দিন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম (২৩)।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত সাড়ে আটটার দিকে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নান এবং যুবদল নেতা ইসরাফিল শেখ তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

নিহত শাকিল গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় খোয়ারপাড়া গ্রামের রবিউল মিস্ত্রির ছেলে। তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থেকে গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করছিলেন।

গত ১৪ অক্টোবর (বুধবার) রাত নয়টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় দুর্বৃত্তদের নৃশংস হামলার শিকার হন শাকিল ইসলাম। হামলার পর গুরুদাসপুর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বিছানায় শুয়ে শাকিল নিজেই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছিলেন।

তিনি জানান, চাঁচকৈড় বাজার থেকে হেঁটে বাড়ি ফেরার পথে বাজারপাড়া এলাকার নুর একাডেমির কাছে পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা হেলমেট পরা দুই ব্যক্তি তাকে লক্ষ্য করে পরপর দুটি গুলি ছোড়ে। গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে তিনি প্রাণভয়ে দৌড়াতে শুরু করেন। এ সময় দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেল নিয়ে তার পিছু নেয়। একপর্যায়ে পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দুলাল সরকারের বাড়ির কাছে পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা তাকে ধরে ফেলে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। শাকিল মাটিতে লুটিয়ে পড়ে চিৎকার শুরু করলে আশপাশের লোকজন ছুটে আসার আগেই হামলাকারীরা মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত সটকে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শী সুমন রহমান জানান, শহীদা জলিল স্কুলের কাছে পরপর দুটি গুলির শব্দ শুনে এগিয়ে গেলে শাকিলকে দৌড়ে পালাতে এবং পেছনে মোটরসাইকেল নিয়ে দুজনকে ধাওয়া করতে দেখেন। এর কিছুক্ষণ পর রক্তাক্ত ধারালো অস্ত্র উঁচিয়ে হামলাকারীদের ফিরে যেতে দেখা যায়। পরে স্কুলের পেছনের অংশ থেকে রক্তাক্ত ও আর্তনাদ করতে থাকা শাকিলকে উদ্ধার করে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়।

গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক নওশিন জাহান জানান, শাকিলের হাত, পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের গভীর ক্ষত ছিল। তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে রাতেই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়।

যুবদল নেতা ইসরাফিল শেখ জানান, হামলার রাতেই রামেকে শাকিলকে অন্তত পাঁচ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় রাতেই তাকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর শারীরিক অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে এবং তার কিডনি বিকল হতে শুরু করে। পরবর্তীতে তাকে ঢাকার পিজি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। সেখানেই দীর্ঘ ১২ দিনের লড়াই শেষে সোমবার রাতে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রাতেই মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন স্বজনরা।

এর আগে গত ১৯ অক্টোবর এ ঘটনায় শাকিলের পিতা রবিউল মিস্ত্রি বাদী হয়ে গুরুদাসপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছিলেন।

গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নান জানান, শাকিলের মৃত্যুর পর পূর্বের মামলাটি এখন সরাসরি হত্যা মামলায় রূপ নেবে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব না হলেও পুলিশ সর্বাত্মক অভিযান চালাচ্ছে। পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের রহস্য উদ্ঘাটনের একেবারেই শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে ছাত্রদল নেতার এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ। তিনি অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে পুলিশ প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে দলীয় নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধরে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

ইত্তেফাক/এনএন