নলকূপ খননের সময় ‘গ্যাসের’ আগুন, ১৪ ঘণ্টা ধরেই জ্বলছে

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২:৩১

কক্সবাজারের উখিয়ায় মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন এলাকায় গভীর নলকূপ খনন করতে গিয়ে মাটির নিচ থেকে তীব্র বেগে বেরিয়ে আসা ‘গ্যাসের’ আগুন টানা ১৪ ঘণ্টা পরও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ করে বিকেল পাঁচটার পর আগুনের লেলিহান শিখা ও তীব্রতা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা এই ভূগর্ভস্থ অগ্নিকাণ্ড দেখতে মেরিন ড্রাইভ ও ইনানীর ছোট ব্রিজ এলাকায় ভিড় জমিয়েছেন উৎসুক জনতা।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ইনানী মেরিন ড্রাইভের ছোট ব্রিজসংলগ্ন মোস্তফা সিকদারের বাড়ির আঙিনায় এই আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে।

স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সকাল থেকেই ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আপ্রাণ চেষ্টা চালান। তবে রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। আগুনের উত্তাপ ও তীব্রতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বেলা তিনটার দিকে আশপাশের এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয়। বড় ধরনের বিপর্যয় বা বিস্ফোরণের ঝুঁকি এড়াতে পুরো এলাকা ঘিরে তৈরি করা হয়েছে কঠোর নিরাপত্তাবলয়। এ ছাড়া মাটির নিচ থেকে ওঠা আগুনের শিখা কাছে থাকা বিদ্যুতের খুঁটি ও প্রধান সরবরাহ লাইনে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য্য জানান, ফায়ার সার্ভিসের সর্বোচ্চ তৎপরতার পরও আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসায় নিরাপত্তাজনিত কারণে আশপাশের বাসিন্দাদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনাস্থল সার্বক্ষণিক নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ দল মোতায়েন রয়েছে। ভূগর্ভে থাকা প্রাকৃতিক গ্যাসের ধরন ও পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) জরুরি ভিত্তিতে অবহিত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, সাধারণ একটি নলকূপ খনন করতে গিয়ে মাটির নিচে প্রাকৃতিক গ্যাসের স্তরের সন্ধান মিলেছে। সার্বিক জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেখানে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার জন্য সরকারের বিশেষজ্ঞ সংস্থা বাপেক্সকে জানানো হলে ঢাকা থেকে দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সন্ধ্যার বিমানে কক্সবাজারে পৌঁছেছে। রাতে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে গ্যাস ও আগুনের গতিপ্রকৃতি যাচাই করে পরবর্তী কারিগরি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

উখিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এক কর্মকর্তা জানান, আগুন জ্বলতে থাকা স্থানটির ঠিক পাশেই বেশ কয়েকটি প্রধান বৈদ্যুতিক খুঁটি রয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের শিখা তারে লেগে পুরো গ্রিডে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার তীব্র ঝুঁকি দেখা দিয়েছিল। ফলে জননিরাপত্তার স্বার্থে পাটুয়ারটেক থেকে মনখালী পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫ কিলোমিটারের লাইনটি সাময়িকভাবে বিদ্যুৎহীন রাখা হয়েছে।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই এলাকায় সরকারি কোনো গ্যাস পাইপলাইন বা সরবরাহ লাইন নেই। ফলে এটি নিশ্চিত যে, ভূগর্ভের প্রাকৃতিক স্তরে গ্যাসের উপস্থিতির কারণেই এই তীব্র অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শামশুল আলম ঘটনার পটভূমি তুলে ধরে জানান, ঢাকার এক ব্যক্তি স্থানীয় মোস্তফা সিকদারের কাছ থেকে কিছু জমি কিনেছিলেন। সেই জমিতে প্রায় ১০-১৫ দিন আগে একটি গভীর নলকূপ বসানোর কাজ শুরু হয়। প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ ফুট গভীরে গিয়েও পানির সন্ধান না পেয়ে সোমবার শ্রমিকেরা ঠিক পাশের আরেকটি স্থানে পুনরায় পাইপ বসানোর কাজ শুরু করেন। এরপর মঙ্গলবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দে নলকূপের পাইপ দিয়ে মাটির নিচ থেকে গ্যাস বেরিয়ে আসে এবং সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে যায়।

শামশুল আলম আরও জানান, প্রথমে স্থানীয় বাসিন্দারা বালু ও পানি ছিটিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে সকাল সাড়ে আটটায় উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট এবং পরবর্তীতে কক্সবাজার শহর থেকে আরও একটি ইউনিট এসে আগুন নেভানোর কাজে যোগ দেয়। তবে গভীর রাত পর্যন্ত আগুন নেভানো সম্ভব না হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, ঠিক ঘটনাস্থলটির লাগোয়া কোনো বসতবাড়ি বা আবাসিক হোটেল-রিসোর্ট না থাকায় বড় ধরনের তাৎক্ষণিক প্রাণহানি বা ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি এড়ানো গেছে।

ইত্তেফাক/এনএন