ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক তোপকাপি প্রাসাদের কাছে সারায়বুর্নু উপকূলে পুনর্নির্মিত হচ্ছে উসমানীয় (অটোমান) আমলের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে নগর সম্প্রসারণের বলি হয়ে প্রায় ৭০ বছর আগে ইস্তাম্বুলের মানচিত্র থেকে মুছে গিয়েছিল এই ধর্মীয় স্থাপনাটি। ঐতিহাসিক নগর উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী ইমারতগুলো পুনরুদ্ধারে নেওয়া একটি বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ হিসেবে মসজিদটি আবার আগের রূপ ফিরিয়ে পাচ্ছে। আগামী রমজান মাসেই স্থাপনাটি পুনরায় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
উসমানীয় সুলতান প্রথম সুলেমানের (সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট) শাসনামলে সারায়বুর্নু ও আহিরকাপির মাঝামাঝি, তোপকাপি প্রাসাদের সমুদ্র প্রাচীরের ঠিক বাইরে নির্মিত হয়েছিল এ মসজিদ। এটি ‘বোস্তানসিলার তাবহানেসি মসজিদ’ বা ‘ইয়েদেকসিলার মসজিদ’ নামে পরিচিত। শুরুতে এটি মূলত রাজপ্রাসাদের রাজকীয় বাগান পরিচর্যা ও নিরাপত্তা কাজে নিয়োজিত ‘বোস্তানসি’ রক্ষীবাহিনীর অসুস্থ সদস্যদের চিকিৎসাসেবা ও প্রার্থনার জন্য ব্যবহৃত হতো। পরবর্তী সময়ে এটি সমুদ্রপথে আসা নাবিকদের কোয়ারেন্টিন সুবিধা এবং অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকাজেও ব্যবহূত হয়।
ফাতাহ পৌরসভার মেয়র মেহমেত এরগুন তুরান আনাদোলু এজেন্সিকে (এএ) জানান, একসময় ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক সমুদ্র প্রাচীরের ঠিক বাইরে একমাত্র প্রার্থনাস্থল ছিল এই মসজিদটি। বসফরাস প্রণালী দিয়ে বা ওপার থেকে ঐতিহাসিক উপদ্বীপের দিকে এগোলে পর্যটকদের চোখে সর্বপ্রথম এই মসজিদের মিনারটিই ধরা পড়ত।
তবে ১৯৩০-এর দশকে স্থাপনাটি অযত্ন-অবহেলায় জরাজীর্ণ হতে থাকে এবং পরবর্তী দশকে এর মিনারটি ভেঙে ফেলা হয়। পরবর্তীতে ১৯৫০-এর দশকে উপকূলীয় সড়ক নির্মাণের সময় ঐতিহাসিক এই উপকূলের নকশায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়, যার ধারাবাহিকতায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায় পুরো মসজিদটি।
২০১৯ সালে পুরোনো আলোকচিত্র, মানচিত্র ও খোদাইচিত্র বিশ্লেষণ করে মসজিদটির আগের অবস্থান ও অবয়ব নিশ্চিত করে আঞ্চলিক সংরক্ষণ বোর্ডের কাছে পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব জমা দেয় ফাতাহ পৌরসভা। সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পর শুরু হয় মূল কাঠামো পুনর্নির্মাণের কাজ।
নতুন পরিকল্পনায় মসজিদটি কেবল নামাজের জায়গাতেই সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না; এর সঙ্গে সংযুক্ত ভবনগুলোকে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মেয়রের বক্তব্য অনুযায়ী, এখানে একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার এবং একটি প্রদর্শনী হল থাকবে, যেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সংগ্রহশালা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে।
ঐতিহাসিক এই কেন্দ্রীয় জেলায় প্রাচীন অবকাঠামো পুনরুদ্ধারের ব্যাপক কর্মসূচি চলছে জানিয়ে তুরান বলেন, এরই মধ্যে হারিয়ে যাওয়া আটটি মসজিদ পুনর্নির্মাণ করে নামাজের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। আরও ১০টি প্রকল্পের কাজ বর্তমানে চলমান এবং ৩০টিরও বেশি কাঠামোর পরিকল্পনা, অনুমোদন ও প্রত্নতাত্ত্বিক খননপ্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।
এই পুরো প্রকল্পে কোনো সরকারি অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে না উল্লেখ করে মেয়র বলেন, মসজিদ পুনর্নির্মাণের সম্পূর্ণ ব্যয় ব্যক্তিগত অনুদান থেকে নির্বাহ করা হচ্ছে। বৃহত্তর এই সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় হারিয়ে যাওয়া সুফি লজ বা তেক্কে, মাদরাসা, ঐতিহ্যবাহী উসমানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রাচীন ফোয়ারা ও ঐতিহাসিক সমাধিস্থলগুলোকেও ফিরিয়ে আনার কাজ অব্যাহত থাকবে।
