ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য 

সরকার-বিএনপি গ্রহণ করেনি

তবে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাফাই আইজিপির বক্তব্য ঠিক হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সরকারের জন্য বিব্রতকর: রিজভী আহমদ

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৯

‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্য গ্রহণ করেনি সরকার। এমনকি সরকারি দল বিএনপিও বলেছে, এই বক্তব্য সরকারকে বিব্রত করার মতো। তবে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে আইজিপির পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছে, আইন ও বিধিবিধানের যথাযথ বাস্তবায়ন, অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা এবং জননিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর সময়োপযোগী আহ্বান এটা।

গত সোমবার রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারে এক অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির বলেছেন, সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ার’ করা হবে। তিনি বলেন, পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে এক পক্ষ পুলিশকে ফ্যাসিস্ট বলে, আবার নিষ্ক্রিয় থাকলে দুর্বল বলে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হবে।

আইজিপির এই বক্তব্য প্রচার হওয়ার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। জামায়াত তাকে ক্ষমা চাইতে বললেও এনসিপি তার পদত্যাগ দাবি করেছে। এমন অবস্থার মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারের পক্ষে বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্যকে সরাসরি নাকচ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘সরকার তো ক্রসফায়ার চায় না; বরং সরকার ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স।’ আইজিপি অসতর্কতাবশত এমন কথা বলেছেন উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা ঠিক হয়নি, উচিত হয়নি।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, সরকার তো ক্রসফায়ার চায় না; বরং সরকার ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স। সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হতে দেবে না, এ বিষয়ে সরকার অত্যন্ত কঠোর। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, কাস্টডিয়াল ডেথ (পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু) সহ্য করবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনের শাসন সরকারের প্রধান লক্ষ্য এবং আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। এ পর্যন্ত ক্রসফায়ারে মৃত্যু এবং হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তবে অপরাধ দমন এবং আইনের যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকার যা যা দরকার, সব করবে।

এর আগে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বিনা মূল্যে চিকিত্সাসেবা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে কথা বলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তিনি ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য সরকারের জন্য বিব্রতকর বলে মন্তব্য করেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, যে বিএনপি দীর্ঘদিন গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, সেই দলের সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় পুলিশপ্রধানের মুখে ক্রসফায়ারের কথা তাদের ভাবিয়ে তুলছে।

রুহুল কবির রিজভী প্রশ্ন রেখে বলেছেন, ‘দুঃখ লাগে, একটা পুলিশ বাহিনীর প্রধান, তিনি সরকারের একটা অংশ। তিনি ক্রসফায়ারের কথা বলেন কী করে? যদি স্লিপ অব টাং করেন, সেটা ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু এটা তো সরকারকে বিব্রত করার মতো অবস্থা। একটি বাহিনীর প্রধান হয়ে আপনার মুখ দিয়ে এ ধরনের কথা সত্যি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। দেশে পর্যাপ্ত আইন আছে। আইন প্রয়োগ করার দায়িত্ব আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। এই আইন দিয়েই সন্ত্রাস, অপরাধ দমন করা সম্ভব। বেআইনি পদ্ধতি কখনোই অপরাধ দমনে কার্যকর হয় না। সে গুম বলুন আর ক্রসফায়ার বলুন।’ এজন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

এর আগে গতকাল দুপুরে ব্রিফিংয়ে তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, আলী হোসেন ফকিরের ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত বক্তব্যের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী জাপান সফর শেষে দেশে ফেরার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, আইজিপি আসলে তার বক্তব্যে যেটা বোঝাতে চেয়েছেন, সে বিষয়টি মিস কমিউনিকেশন হয়েছে। তিনি এটা ওন করেন না। তিনি বিষয়টার ক্ল্যারিফিকেশন দিয়েছেন। এ সময় ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘আইজিপির ব্যাপারে যদি অন্য সিদ্ধান্ত নিতে হয় তাহলে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পর বিবেচনা করবেন।’

তবে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে আইজিপির বক্তব্যের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছে, আইজিপির বক্তব্যকে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের যথাযথ, দৃঢ়, আপসহীন বাস্তবায়ন এবং পুলিশ সদস্যদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিতকরণ এবং জননিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশের সক্ষমতা আরো সুদৃঢ় করার একটি সময়োপযোগী আহ্বান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

সংগঠনটি বিবৃতিতে বলেছে, পুলিশের আইনানুগ কঠোরতাকে একদিকে নেতিবাচকভাবে দেখা এবং অপরাধ দমনে নিষ্ক্রিয়তাকে অন্যদিকে দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে। অপরাধ দমনে পুলিশ যদি তার আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগে অযথা দ্বিধাগ্রস্ত হয়, তবে অপরাধীরা উত্সাহিত হতে পারে এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অন্যদিকে, আইনের সীমা অতিক্রম না করে দৃঢ়তা, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনই পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা সুদৃঢ় করার মূল ভিত্তি। সাম্প্র্রতিক সময়ে দেশের পরিবর্তিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মব কালচার এবং গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের আইন প্রয়োগে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

ইত্তেফাক/এনএন