গাজায় এতিম ৭১ হাজার শিশু, বিধবা ৬৪ হাজার নারী

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৪

ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক হামলা ও গণহত্যার ভয়াবহতায় ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডে মানবিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। সেখানে অন্তত ৭১ হাজার শিশু এতিম হয়েছে এবং স্বামী হারিয়েছেন প্রায় ৬৪ হাজার নারী।

এছাড়া দেখাশোনা করার মতো বা নিবন্ধিত কোনো অভিভাবক নেই, এমন শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজারে। খাদ্য ও আশ্রয় সংকট, দারিদ্র্য এবং বাস্তুচ্যুতির কারণে এসব শিশু ও নারীর ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তায়।

লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজার সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত মা-বাবা কিংবা উভয়েকেই হারিয়েছে অন্তত ৫৪ হাজার ৪৬৮টি শিশু। তবে মোট ৭১ হাজার এতিম শিশু ও ৬৪ হাজার স্বামীহারা নারীর পরিসংখ্যানে আগের বছরগুলোর ইসরায়েলি হামলায় স্বজন হারানোদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অভিভাবকহীন এসব শিশুর কষ্টের চিত্র ফুটে উঠেছে আবু আসের তিন ভাইবোনের দৈনন্দিন জীবনে। ১৬ বছর বয়সি মারিয়াম, ১৪ বছরের আয়া ও ১২ বছরের জিবরিল প্রতি দুই দিন পর পর এক খালার তাঁবু থেকে অন্য খালার তাঁবুতে আশ্রয় নেয়। ২০১৪ সালে ইসরায়েলি অভিযানে বাবাকে হারানোর পর ২০২৩ সালে গাজা শহরের বাড়ি ধ্বংস হলে মা ইসলামের সঙ্গে মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকায় তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছিল তারা।

২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার মাত্র ১৯ দিন পর ইসরায়েলি বোমা হামলায় মারা যান তাদের মা-ও। হামলায় আহত হয় ছোট ভাই জিবরিল, যে বিস্ফোরণের সময় মায়ের কোলেই বসা ছিল।

বর্তমানে নিজেদের সন্তানদের পাশাপাশি এতিম তিন ভাগনে-ভাগনিকে সামলাচ্ছেন তাদের স্বামীহারা দুই খালা। স্বজন হারানো ওয়ারদা আল-মুজেইনি জানান, স্থায়ী কোনো বাসস্থান না থাকায় শিশুরা একেক খালার তাঁবুতে দুই রাত করে থাকে। দিনশেষে একবেলা খাবার জোগাড় করতেই তাদের চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে।

একইভাবে পরিবারের সবাইকে হারিয়ে একা বেঁচে থাকার করুণ গল্প ১০ বছরের ওয়াফা আল-আত্তারের। ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বাবার ফোনে চার্জ দিতে পাশের বাড়িতে গেলে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে যায় তাদের নিজ বাড়ি। এতে প্রাণ হারান তাঁর বাবা-মা এবং চার ভাইবোন। চোখের পলকেই পুরো পরিবারকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ে এই শিশু। বর্তমানে চাচা-চাচির আশ্রয়ে থাকলেও পরিবারের শূন্যতা তার জীবনকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়।

গাজার সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আজিজা আল-খালুত সতর্ক করে বলেছেন, এতিম শিশুরা কেবল অভিভাবকই হারায়নি; তারা নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাভাবিক শৈশব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবক্ষয় ও আশ্রয়ের অভাবে শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হওয়া, অল্প বয়সে বিয়ে এবং শিশুশ্রমের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

কর্মকর্তারা জানান, কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে গাজার এসব এতিম শিশু ও স্বামীহারা নারীদের করুণ পরিস্থিতির গভীরতা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়ানো এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য দ্রুত খাদ্য, নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ইত্তেফাক/পিএস