দীপের বক্তব্যে ‘আশ্বস্ত’ নয় পিবিআই, ধাওয়া খেয়ে নদীতে ঝাঁপের দাবি মানছেন না তাহসিফের বাবা

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৪৬

ঢাকার তুরাগ নদের যে স্থান (রাজবাড়ী ঘাট) থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, এর কাছাকাছি এলাকায় একটি মোটরসাইকেল পাওয়া গেছে। তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনার বিষয়ে তার ‘বন্ধু’ শাহরিয়ার রেজা দীপ বলেছেন, ২৭ অক্টোবর রাতে তুরাগ নদী সংলগ্ন এলাকায় কিছু লোক ধাওয়া দিলে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। তার দাবি, লোকগুলো ‘ইউনিফর্ম’ পরা ছিল।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কর্মকর্তাদের দীপ এ কথা জানিয়েছেন।

গতকাল রাতে দীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর তাহসিফ আর তিনি একসঙ্গে যেখানে যেখানে গিয়েছিলেন, সেসব জায়গা পরিদর্শন করেছে পিবিআই।

শুক্রবার সরেজমিনে দেখা গেছে, দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল টঙ্গীর তুরাগ নদীর ২৯ নম্বর সীমানা পিলার এলাকার মাঠ পরিদর্শন করছে পিবিআই। সেখানে ঘটনার রাতের বর্ণনা দিচ্ছেন দীপ। 

দীপ বলেন, ‘দূর থেকে আমাদের কয়েকজন ধাওয়া দেয়। ভাই (তাহসিফ) দৌড় দেন। আমি তখন পিলারের পেছনে এসে আমি দাঁড়াই এবং আশা করতে থাকি দুজন ইউনিফর্ম পরা লোক আমাকে দেখতে না পায়। আমি দৌড় দেইনি, হেঁটে হেঁটে আসি।’

দীপের বরাতে পিবিআইয়ের এক তদন্ত কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দীপের দাবি ঘটনার দিন তিনি তাহসিফের সঙ্গে তুরাগ সংলগ্ন মাজার বস্তিতে যান। সেখানে যখন তারা কথা বলছিলেন, তখন কিছু লোক তাদের ধাওয়া দিলে দীপ তুরাগ তীরে স্থাপিত বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে গিয়ে লুকান। এরপর সুযোগ বুঝে দীপ সেখান থেকে চলে আসেন। রাত আড়াইটার দিকে নিজের বাড়িতে ফেরেন দীপ।’

পিবিআইয়ের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমরা এখনো তার (দীপের) বক্তব্যে পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছি না। মামলার অন্যান্য দিকগুলো মাথায় রেখে আমরা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি।’

পিবিআই মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, আমরা দীপের দেওয়া বিভিন্ন তথ্য আমরা যাচাই-বাছাই করেছি। আমরা আসলে প্রকৃত সত্য জানার জন্য তদন্ত করছি। তারা ওইখানে কেন গিয়েছিল, তাকে কেউ হত্যা করেছে নাকি দুর্ঘটনা, নাকি আত্মহত্যা, এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা খুঁজছি। এখন পর্যন্ত যেসব উত্তর পাওয়া গেছে সেগুলো যাচাই করা প্রয়োজন। আপাতত আমরা তদন্ত করছি, রহস্য উদঘাটন হলে পরে জানানো হবে।

পিবিআইকে দীপের দেওয়া তথ্যের বিষয়ে তাহসিফের বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম বলেন, ‘না না, এ ধরনের কিছু হতে পারে না। কেন তাকে ধাওয়া দিতে যাবে? এগুলো বাজে কথা, প্রশ্নই আসে না। আমার ছেলে সাঁতার জানত। ও তো পাইলট। ওদের সুইমিংয়ের কোর্স করা এবং তার ওপর সার্টিফিকেট আছে। সাঁতারের ওপর বড় ধরনের কোর্স করা আছে আমার ছেলের।’

ঘটনা আড়াল করা কিংবা কোনো ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা করছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে তো এটাই মনে হয়। তো আর ওকে ধাওয়া দেবে কেন লোকজন, কেন তাকে কেউ ধাওয়া দেবে? ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে বলে আমার মনে হচ্ছে।’

এদিকে তুরাগ নদে তাহসিফের ভাসমান লাশ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে টঙ্গী পশ্চিম থানার অধীন মাজার বস্তি এলাকায় নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।

পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ এক বার্তায় নিশ্চিত করেন, তুরাগ নদ থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দূরে মোটরসাইকেলটি পাওয়া গেছে এবং এটি তাহসিফের কি না তা যাচাই করা হচ্ছে।

মাজার সংলগ্ন একটি চায়ের দোকানের দোকানি জুবায়দা বেগম জানান, মোটরসাইকেলটি গত ২ দিন ধরে তার দোকান থেকে প্রায় ১৫-২০ মিটার দূরে সড়কে রাখা ছিল।

জুবায়দা আরও বলেন, 'দুই দিন ধরে মোটরসাইকেলটি দেখছি। কিন্তু এটা নেয়নি। আমরা ভেবেছি কেউ হয়তো রেখে গেছে। আজ সকালে পুলিশ একটি ভ্যানে করে এসে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যায়। পরে তারা আবার নিয়ে আসে।

পিবিআইয়ের অন্য এক পুলিশ সুপার জানান, দীপের দেখানো তথ্যের ভিত্তিতেই মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। নম্বরপ্লেট না থাকায় মালিকানা যাচাই চলছে। তবে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, তাহসিফও ঘর থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলেন।

তাহসিফ গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে বের হন। সেদিন দিবাগত রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে মুঠোফোনে বার্তা (ভয়েস মেসেজ) পাঠিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন বাসায় ফিরছেন। কিন্তু আর ফেরেননি।

পরদিন বুধবার বিকেলে উত্তরখান থানা এলাকার রাজবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের লাশ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তাহসিফ তার মোটরসাইকেলটি সঙ্গে নিয়েছিলেন।

তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে তাকে এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা যায়। পরিবারের সদস্যরা ওই ব্যক্তিকে দীপ হিসেবে শনাক্ত করেন।

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় দীপকে হেফাজতে নেয় পিবিআই। গতকাল দিবাগত রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার একটি বাসা থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়।

ইত্তেফাক/আরআর