গরু ছাড়াই ‘আসল দুধ’ তৈরির কারখানা!

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৪০

দুধ উৎপাদনের জন্য গরুর প্রয়োজন হয়, ঘাস লাগে, গোয়ালঘর লাগে, গরুর যত্ন নিতে হয়। এই সকল ঝামেলা ছাড়াই যদি দুধ উৎপাদন করা যায়, তাহা হইলে মন্দ কী! পুঁজির পরিমাণও কম, উৎপাদন খরচও কম, লাভের অঙ্কও বড়। পাবনার ভাঙ্গুড়ায় আবুল বাশার নামের এক ব্যবসায়ী এই অসাধ্য সাধন করিয়াছেন। তাহার কারখানায় গরু নাই, দুধ দোহনের প্রয়োজন নাই, অথচ দিব্যি উৎপাদিত হইতেছে 'আসল দুধ'! জেলি, সয়াবিন তৈল, পানি ও চিনি ব্লেন্ডিং করিলেই তৈরি হইয়া যাইতেছে এই অভিনব খাদ্যপণ্য। আধুনিক প্রযুক্তির এমন যুগান্তকারী ব্যবহার দেখিয়া দুগ্ধশিল্পের উদ্যোক্তারা নিশ্চয়ই নতুন করিয়া ভাবিতে পারেন! ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, গত শুক্রবার ভাঙ্গুড়ার কৈডাঙ্গা নতুনপাড়ায় আবুল বাশারের বাড়ির কারখানায় অভিযান চালাইয়া ২ হাজার ৭০০ লিটার জেলি, ২০০ কেজি সয়াবিন তৈল এবং ৩২০ লিটার নকল দুধ জব্দ করা হইয়াছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত কারখানার মালিককে এক বৎসরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা জরিমানা এবং তাহার সহযোগী কর্মচারীকে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করিয়াছেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইয়া এই দুধ তৈরির প্রক্রিয়াও পর্যবেক্ষণ করিয়াছেন। অর্থাৎ, দুধের কারখানায় গরুর অনুপস্থিতি সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ ছিল না।

কিন্তু এই কৌতুকের আড়ালে রহিয়াছে ভয়াবহ এক অপরাধের কাহিনী। দুধ শিশুদের অন্যতম প্রধান খাদ্য। পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী মাতা-পিতারা সন্তানের মুখে দুধ তুলিয়া দেন এই বিশ্বাসে যে, তাহাতে অন্তত কিছু পুষ্টি মিলিবে। অথচ সেই দুধের নামে যদি জেলি, তৈল ও চিনির মিশ্রণ বিক্রি হয়, তাহা হইলে শিশুর শরীরে কী প্রবেশ করিতেছে, তাহা ভাবিলেই শিহরিত হইতে হয়। সংবাদে বলা হইয়াছে, এই নকল দুধ পান করিয়া অনেক শিশু পেটের পীড়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হইয়াছে। অর্থাৎ, মুনাফার হিসাব কষিতে গিয়া কতগুলি শিশুর স্বাস্থ্যের মূল্য যে পূর্বেই আদায় করা হইয়াছে, তাহার হিসাব কে রাখিবে? আরও উদ্বেগের বিষয়, এই কারখানায় ইতিপূর্বে একাধিক বার অভিযান চালাইয়া নকল দুধ তৈরির উপকরণ পাওয়া গেলেও এবারই প্রথম মালিককে কারাদণ্ড দেওয়া হইল। এলাকাবাসীর ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরিয়া এই ব্যবসা চলিতেছে এবং বিভিন্ন কোম্পানির কাছে নকল দুধ বিক্রি করিয়া আবুল বাশার বিপুল অর্থের মালিক হইয়াছেন। প্রশ্ন হইল, একাধিক বার অভিযানের পরও যদি একটি ভেজাল কারখানা বন্ধ না হয়, তাহা হইলে সেই অভিযানের কার্যকারিতা কোথায়? জরিমানা কিংবা সাময়িক জব্দের ভয় উপেক্ষা করিয়াই যদি অপরাধীরা ব্যবসা চালাইতে পারে, তাহা হইলে আইনের শাসন তাহাদের নিকট নিছক ব্যবসায়িক ঝুঁকি মাত্র।

এইখানে আরেকটি প্রশ্ন উপেক্ষা করিবার উপায় নাই। বিভিন্ন কোম্পানির নিকট এই নকল দুধ বিক্রির অভিযোগ উঠিয়াছে। তাহা হইলে সেই কোম্পানিগুলির পরিচয় কী? তাহারা কি জানিত যে, এই দুধ গরুর গোয়াল হইতে আসে নাই, আসিয়াছে রাসায়নিক মিশ্রণের কারখানা হইতে? সরবরাহব্যবস্থার অন্য কোনো স্তরে এই ভেজাল প্রবেশ করিয়াছে কি না, তাহাও তদন্ত করিয়া দেখা প্রয়োজন। খাদ্যে ভেজাল মেশানোকে কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ হিসাবে দেখিবার সুযোগ নাই। ইহা জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে অপরাধ, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শরীরের বিরুদ্ধে অপরাধ। বিশেষত শিশুখাদ্যের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় চলিতে পারে না। জনৈক আবুল বাশারের কারখানায় গরু ছাড়াই দুধ তৈরি হইয়াছে; কিন্তু এই অভিনব আবিষ্কারের প্রকৃত মূল্য পরিশোধ করিতেছে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করিয়া শিশুরা। এখন প্রশ্ন, দেশে আর কতগুলি এমন গোয়ালবিহীন গোয়ালঘর রহিয়াছে? ভেজালকারীরা যদি মানুষের খাদ্যকে নিজেদের মুনাফার কাঁচামাল মনে করে, তাহা হইলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুদায়িত্ব হইল তাহাদের সেই ব্যবসার গোড়ায় আঘাত করা। আমরা কি তাহা করিতেছি?

ইত্তেফাক/এমএস

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন