শেরপুরের শ্রীবরদীতে প্লাস্টিকের ড্রামে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার হওয়া নারীর মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। একই সঙ্গে এই হত্যাকান্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে সংস্থাটি।
পিবিআইয়ের দাবি, অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের জেরে ওই নারীকে হত্যা করা হয়।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন- পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার দিঘলগ্রামের আঃ রশিদের ছেলে নূর ইসলাম ওরফে বাবু (৪৪), জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার বাঘমারা শিশুয়া গ্রামের আলাউদ্দিনের ছেলে সজল (৪৪), শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার গড়জরিপা এলাকার আইবালীর ছেলে নূর মোহাম্মদ গোসা ওরফে বুশা (৪৪) এবং কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার কুশিয়ারা এলাকার নায়েব আলী ভূঁইয়ার মেয়ে মাহাবুবা আক্তার ওরফে ফাতেমা (৪৪)।
রোববার (১ নভেম্বর) দুপুরে শেরপুর জেলা শহরের পুরাতন গরুহাটি এলাকায় পিবিআই কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির পুলিশ সুপার পংকজ দত্ত।
পিবিআই জানায়, গত ২২ অক্টোবর সকালে শ্রীবরদী উপজেলার কুড়িকাহনিয়া এলাকায় একটি সেতুর নিচে খালে বড় নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রাম ভাসতে দেখেন স্থানীয়রা। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ স্থানীয়দের সহায়তায় ড্রামটি খুলে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে। তার শরীরে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতসহ ক্ষতচিহ্ন ছিল। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পিবিআই। তদন্তের একপর্যায়ে নিহত নারীর পরিচয় শনাক্ত হয়।
নিহত নারীর নাম ঝিনুক আক্তার। তিনি গাজীপুরের টঙ্গীর এরশাদনগর এলাকার শাকিল মিয়ার মেয়ে।
ঘটনায় পরদিন ২৩ অক্টোবর নিহতের ফুফু শিরিনা আক্তার বাদী হয়ে ঝিনুকের স্বামী সাইফুল ইসলাম মুন্নাসহ অজ্ঞাতনামা চার-পাঁচজনকে আসামি করে শ্রীবরদী থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার পর থেকেই ছায়া তদন্ত শুরু করে পিবিআই।
তদন্তে পাওয়া তথ্য, গোয়েন্দা নজরদারি ও বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ করে প্রথমে ২৯ অক্টোবর পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার দিঘলগ্রাম থেকে নূর ইসলাম ওরফে বাবুকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩০ অক্টোবর ঢাকার উত্তরখান এলাকা থেকে সজলকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ১ নভেম্বর একই এলাকা থেকে নূর মোহাম্মদ ওরফে গোসা ওরফে বুশা এবং মাহাবুবা আক্তার ওরফে ফাতেমাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআইয় বলছে, ঝিনুক টঙ্গীর একটি পার্লারে কাজ করতেন। গত ২১ অক্টোবর দুপুরে সজল ও নূর ইসলাম ওরফে বাবুর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের পর তিনি ঢাকার উত্তরখানের কবিরশাহ মাজার এলাকায় যান। সেখান থেকে মাহাবুবা আক্তার ওরফে ফাতেমা এবং নূর মোহাম্মদ ওরফে বুশা তাকে দক্ষিণখানের মৌশাইর এলাকার একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যান।
পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে, ওই বাসায় আরও কয়েকজনের সঙ্গে ঝিনুককে শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করা হয়। রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাড়ি ফেরার সময় তাকে ১ হাজার ২০০ টাকা দেওয়া হয়। তবে তিনি আরও টাকা দাবি করলে ফাতেমার সঙ্গে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। একপর্যায়ে ফাতেমা ঘরে থাকা বটি দিয়ে ঝিনুককে এলোপাতাড়ি কোপান। অন্যরা তার হাত-পা চেপে ধরেন এবং গলায় গামছা পেঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেন বলে দাবি পিবিআইয়ের।
পরে মরদেহটি একটি প্লাস্টিকের ড্রামে ভরে অজ্ঞাত একটি গাড়িতে করে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে শেরপুরের শ্রীবরদীর ওই খালে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর তারা সেখান থেকে পালিয়ে যান।
সংস্থাটি আরও জানায়, গ্রেপ্তার নূর ইসলাম ওরফে বাবু আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পিবিআই শেরপুরের পুলিশ সুপার পংকজ দত্ত বলেন, এটি ছিল একটি ক্লুলেস হত্যা মামলা। ঘটনার পর থেকে পিবিআইয়ের সদস্যরা সমন্বিতভাবে তদন্ত চালিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন এবং চারজনকে গ্রেপ্তার করেছেন। অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ থেকেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
