গণপিটুনির নৃশংসতা লইয়া গত মাসের শেষে আমরা লিখিয়াছি। অতীতেও অনেকবার লেখা হইয়াছে। ইহা দুঃখজনক যে, আমাদের বারংবার এই বিষয়টি লইয়া লিখিতে হইতেছে। ইহা প্রকৃত অর্থে, আমাদের সমাজের সুস্থতার প্রশ্ন। সুস্থতা না আসা অবধি এই অসুস্থতার কথা তো বারংবার উচ্চারণ করিতেই হইবে। কার্পেটের তলায় নোংরা-জীবাণু চাপা দিয়া রাখিয়া তো ঘরকে হাইজেনিক রাখা যায় না। গতকাল পত্রিকান্তরে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) একটি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হইয়াছে। তাহাতে বলা হইয়াছে, গত অক্টোবর মাসে দেশ জুড়িয়া গণপিটুনিতে ৩২ জন নিহত এবং ৫৪ জন আহত হইয়াছেন। সেপ্টেম্বর মাসে এই সংখ্যা ছিল ২৩। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনা বাড়িয়াছে প্রায় ৩৯ শতাংশ। নিহতদের মধ্যে ১৪ জনের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ ছিল, পাঁচ জন নিহত হইয়াছে ঝগড়ার জেরে। চাঁদাবাজি, জমিসংক্রান্ত বিরোধ, পূর্বশত্রুতা ও মাদক-সংশ্লিষ্ট ঘটনাসহ বিভিন্ন কারণে প্রাণ হারাইয়াছে আরও ১১ জন। কী আশ্চর্য! অভিযোগ উঠিলেই যেন মানুষের জীবনের মূল্য শূন্য হইয়া যায়। কে অপরাধী, কে নিরপরাধ, তাহা নির্ধারণের আগেই জনতা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করিয়া ফেলে!
এই প্রবণতা কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক উন্মাদনা নহে। ইহার পিছনে রহিয়াছে দীর্ঘদিনের বিচারহীনতা, আইনের প্রতি আস্থার সংকট, রাজনৈতিক ও সামাজিক আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা এবং একধরনের প্রতিহিংসাপরায়ণ মনস্তত্ত্ব। মানুষ যখন দেখিতে পায়, অপরাধ করিয়াও অনেকে পার পাইয়া যায়, তখন আইনের প্রতি তাহার আস্থা কমে। কিন্তু সেই হতাশা যখন প্রতিশোধের উন্মত্ততায় রূপ নেয়, তখন নিরপরাধ মানুষের জীবনও বিপন্ন হয়। জনতা তখন অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে না, সাক্ষ্যপ্রমাণের অপেক্ষা করে না, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয় না। মুহূর্তের মধ্যে কয়েক জন মানুষ মিলিয়া একজন মানুষের বিচারক, জল্লাদ ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কারিগর হইয়া উঠে। সবচাইতে উদ্বেগের বিষয় হইল, গত দুই-তিন বৎসরে এই প্রবণতা বিপজ্জনক মাত্রা লাভ করিয়াছে। বিশেষত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গণপিটুনির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের দৃশ্যমান ও কঠোর অবস্থান অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত ছিল বলিয়া জনমনে ধারণা জন্মিয়াছে। রাষ্ট্রের এই নীরবতা জনতার মধ্যে একধরনের দায়মুক্তির মনোভাব তৈরি করিতে পারে। মানুষ যখন বুঝিতে পারে, সংঘবদ্ধ হইয়া কাউকে হত্যা করিলেও শাস্তির ভয় তেমন নাই, তখন আইন নিজের হাতে তুলিয়া লইবার সাহস বাড়ে। রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের জায়গাটি তখন দখল করিয়া লয় উচ্ছৃঙ্খল জনতা।
এমএসএফের প্রতিবেদনেই অক্টোবর মাসে ২৫টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১৪ জন নিহত হওয়ার তথ্য রহিয়াছে। আবার নদী, সড়ক, রেলপথ ও কৃষিজমি হইতে উদ্ধার করা হইয়াছে ৭৩টি অজ্ঞাতনামা মরদেহ। এই পরিসংখ্যানগুলিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখিবার অবকাশ নাই। দেশের মানুষের নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতি ও আইনের শাসন যে গভীর পরীক্ষার সম্মুখীন, তাহারই ইঙ্গিত মিলিতেছে ইহাতে। মানবাধিকার সংস্থাগুলি প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত পুলিশি পদক্ষেপ এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানাইয়াছে। এই দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণের অবকাশ কোথায়? রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব মানুষের জীবন রক্ষা করা। কোনো অভিযোগ উঠিলে অভিযুক্তকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করিতে হইবে, তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটিত হইবে এবং আদালত অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করিবে। এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটুকু নিশ্চিত করিতে না পারিলে রাষ্ট্রের অস্তিত্বের নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হইয়া পড়ে। একই সঙ্গে গণপিটুনিতে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে শনাক্ত করিয়া আইনের আওতায় আনিতে হইবে। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা জনসমর্থন যেন বিচারের পথে বাধা হইয়া না দাঁড়ায়।
একটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন, মানুষকে হত্যা করিবার জন্য জনতার অনুমতির প্রয়োজন হয় না, কিন্তু মানুষকে বাঁচাইবার জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব অপরিসীম। সেই দায়িত্বে কোনো অবহেলার সুযোগ নাই। সুতরাং গণপিটুনির এই নৃশংস ধারা বন্ধ করিতেই হইবে।
