ফরিদপুরের মধুখালীতে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার স্কুলছাত্রী প্রায় দেড় মাস চিকিত্সাধীন থাকার পর মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুর আগে এক ভিডিওতে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে অভিযুক্তদের নাম বলে গেছেন ঐ কিশোরী, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এ ঘটনায় থানা মামলা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীর পরিবার।
ভুক্তভোগী কিশোরীর নাম মিথিলা আক্তার। তিনি উপজেলার আড়পাড়া ইউনিয়নের রাজধরপুর গ্রামের আ. হান্নানের মেয়ে এবং স্থানীয় কাজী সিরাজুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। গত ১৪ সেপ্টেম্বর সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ধর্ষণের পর হারপিক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন মিথিলা। তারপর থেকেই তিনি চিকিত্সাধীন ছিলেন এবং গত ২৬ অক্টোবর দিবাগত রাত ১টার দিকে নিজ বাড়িতেই মৃত্যু হয় মিথিলার। তাকে জোর করে তুলে নেওয়ার ঘটনার তিন মাস আগে পারিবারিক সিদ্ধান্তে আনুষ্ঠানিকভাবে তার বিয়ের কাবিনও হয়েছিল।
মিথিলার বাবা হান্নান গতকাল সোমবার জানান, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে স্কুলে যাওয়ার পথে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক থেকে পার্শ্ববর্তী মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামের রাফি শেখ (২১), রায়নগর গ্রামের রাহুল শেখ (২০), সায়মন বিশ্বাস (২০) জোরপূর্বক তার মেয়েকে মোটরসাইকেলে করে তুলে নিয়ে যায়। এরপর মাগুরার শ্রীপুর থানাধীন নাকোল গ্রামের মধুমতি নদীর মাটিকাটা ঘাট নামক এলাকায় নিয়ে গিয়ে তিন যুবক ধর্ষণ করেন মিথিলাকে। সহযোগিতা করে সোহাগ শেখ (২০) নামের আরেক যুবক। এক পর্যায়ে তাদের হাত থেকে ছুটে গিয়ে মধুমতি নদীতে ঝাঁপ দেয় মিথিলা। স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মিথিলাকে উদ্ধার করে নাকোল পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যায়। পুলিশ ফাঁড়ির বাথরুমে গিয়ে সেখানে থাকা বিষাক্ত হারপিক পান করে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন মিথিলা। ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১১ দিন চিকিত্সা শেষে বাড়িতে নিয়ে যায় পরিবারের সদস্যরা। এরপর থেকে শারীরিক নানা জটিলতা নিয়ে বাড়িতে রেখেই তার চিকিত্সা চলছিল। তার মৃত্যুর খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে এবং ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু এ ঘটনায় থানা মামলা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীর পরিবার।
এদিকে, মৃত্যুর আগে এক ভিডিওতে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে গেছেন মিথিলা, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে বলতে শোনা যায়, তাকে মোটরসাইকেলে জোড়পূর্বক তুলে নিয়ে যায় রাফি শেখ, রাহুল শেখ ও সায়মন বিশ্বাস। সহযোগিতা করে সোহাগ শেখ।
মিথিলার মা জেসমিন খাতুনের ভাষ্য মতে, এ ঘটনার পর পরিবারের সদস্যদের থানায় ডেকে নেন মধুখালী থানা পুলিশ। পরে তাদের শ্রীপুর থানায় পাঠানো হয়। সেখানে মামলা না নিয়ে জোরপূর্বক একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর রেখে তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
মিথিলার ভগ্নিপতি বিল্পব শেখ অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার শ্যালিকাকে তুলে নেওয়ার তিন মাস আগে অন্য জায়গা কাবিন হয়েছিল। এতে ওর মামাতো ভাই ক্ষিপ্ত হয়, কারণ সে বিয়ে করতে চেয়েছিল। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী রাফির সঙ্গে যোগাযোগ করে এই ঘটনা ঘটায়।’
তিনি আরো জানান, মিথিলা সুস্থ হওয়ার পর ঘটনাটি তাদের জানিয়েছিল। কিন্তু ওর নতুন বিয়ে হওয়ার কথা ভেবে তারা কোথাও জানায়নি। তিনি ঐ চার জনের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।
শ্রীপুর থানা পুলিশ বলছে, রাফি শেখের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল মিথিলার। এর মধ্যে মিথিলার অন্যত্র বিয়ে হয়। এর জের ধরে ১৪ সেপ্টেম্বর মধুমতি নদীর মাটিকাটা ঘাট এলাকায় দুই জনে দীর্ঘ সময় গল্প করে এবং নদীতে ঝাঁপ দেয়। যা ঘাটে থাকা রফিকুল মাঝি দেখতে পেয়ে স্থানীয়দের জানায়। পরে স্থানীয় ফাঁড়ির পুলিশ উদ্ধার করে নিয়ে যায় এবং এক পর্যায়ে বাথরুমে গিয়ে হারপিক খেয়েছিল মিথিলা। শ্রীপুর থানার ওসি মো. ওলি মিয়া বলেন, ‘এ ঘটনায় আমরা একটি তদন্ত প্রতিবেদন করেছি। তদন্তে ঐ ঘাট এলাকায় ধর্ষণের শিকার হয়েছে এমন আলামত পাওয়া যায়নি। কারণ, ঘাটটির আশপাশে ঝোঁপঝাড় নেই এবং ফাঁকা। তাছাড়া সেখানে মানুষের যাতায়াত এবং সার্বক্ষণিক মাঝি থাকে। তারা কেউ এ ধরনের দৃশ্য দেখেনি। তবে অন্য কোথাও ধর্ষণ করেছে কি না সেটা আমার জানা নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘মেয়েটিকে যখন উদ্ধার করা হয় তখন ধর্ষণের কথা জানায়নি। এমনকি দেড় মাসেও কেউ জানায়নি। তার মৃত্যুর পর একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে পরিবার, যা রহস্যজনক।’
তিনি আরো জানান, তার পরিবারের সদস্যরা ফাঁড়িতে এলে মিথিলাকে তাদের জিম্মায় দেওয়া হয়। এ সময় ফাঁড়ির বাথরুমে গিয়ে হারপিক খায় কিশোরী। পরে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যায়। তবে ধর্ষণের বিষয়টি পুলিশকে জানায়নি ঐ কিশোরী। তিনি আরো জানান, যেহেতু চিকিত্সাধীন অবস্থায় তার বাড়ি মধুখালীতে মারা গেছে, সে কারণে মধুখালী থানা ব্যবস্থা নিবে।
এ বিষয়ে মধুখালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সুকদেব রায় বলেন, ‘ঘটনাটি জানার পর শ্রীপুর থানায় যোগাযোগ করি এবং থানার ওসি পরিবারকে পাঠিয়ে দিতে বলে। এরপর তারা শ্রীপুরে গেলে একটি অপমৃত্যুর মামলা নেওয়া হয়। পরবর্তী সময় জানতে পেরেছি মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। কিন্তু দেড় মাস আগের ঘটনাটি আমাদেরকে কেউ জানায়নি। আজ সোমবার মিথিলার বাবা আ. হান্নান চার জনকে আসামি করে একটি অভিযোগপত্র দায়ের করেছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তসাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
