গত সপ্তাহের সাধারণ নির্বাচনে রেকর্ড পরিমাণ ১৯টি আসনে জয়লাভ করা ইসরায়েলের আরব দলগুলো বিরোধী দলীয় নেতা গাডি আইজেনকোটের জোটকে সমর্থন দিতে যাচ্ছে। এতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পুনরায় সরকারপ্রধান হওয়ার সম্ভাবনাকে আরও নড়বড়ে করে দিয়েছে। সোমবার (২ নভেম্বর) আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই রাজনৈতিক সমীকরণের তথ্য প্রকাশ করা হয়।
১২০ আসনের নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন, যেখানে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কনজারভেটিভ ও চরমপন্থী দলগুলোর জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অপরদিকে আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টির নেতৃত্বাধীন প্রধান চার দলের বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। তবে ইসরায়েলি ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান দুটি আরব দলের সঙ্গে হাত মেলালে সরকার গঠনের রাজনৈতিক অচল অবস্থা ও পুনরায় নির্বাচন এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
ইতিমধ্যে পরিবর্তনকামী বিরোধী জোট নেতানিয়াহুর সঙ্গে হাত না মেলানোর অঙ্গীকার করেছে, যার পেছনে গত ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলার সময়ের নিরাপত্তা ব্যর্থতা এবং বর্তমানে চলমান দুর্নীতি মামলার কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আরব দলগুলোর সমর্থন নেওয়া আইজেনকোটের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ নেতানিয়াহুসহ বিভিন্ন নেতারা ইহুদি ভোটারদের আকৃষ্ট করতে প্রকাশ্যে আরববিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন। ৭ অক্টোবরের পর থেকে আরবদের রাজনীতিতে আরও বেশি কোণঠাসা করা হয় এবং অন্তত তিনজন ফিলিস্তিনি আইন প্রণেতাকে গ্রেপ্তারও করা হয়।
নির্বাচনে আরব ভোটারদের উপস্থিতি প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছানোয় মনসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন রাম আটটি এবং ইউসেফ জাবারিনের নেতৃত্বাধীন যৌথ তালিকা বা জয়েন্ট লিস্ট ১১টি আসনে জয় পায়। পূর্বে আইজেনকোট ইহুদি জনরোষ এড়াতে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট না করার কথা বললেও বর্তমানে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য উভয় পক্ষকেই কিছু বিষয়ে আপস করতে হতে পারে।
নির্বাচনে কারচুপির দাবি তুলে নেতানিয়াহু ও তার দল লিকুদ দাবি করেছে, আরব দলগুলো বিদেশি সহায়তায় অনিয়ম করেছে। ভোটারদের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে তিন রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেপ্তারের ঘটনার কথা তারা উল্লেখ করলেও রোববার এক সন্দেহভাজনকে আদালত মুক্ত করে দেয় এবং অন্যজনকে গৃহবন্দী করে।
নির্বাচন কমিশনের প্রধান নোয়াম সোহলবার্গ অ্যাটর্নি জেনারেল ও শিন বেটের প্রধানের সঙ্গে যৌথ ভিডিও বার্তায় ভোটের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমাদের অবস্থান হলো সন্দেহগুলো প্রমাণিত হলেও এটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সততা বা সামগ্রিক নির্বাচনের ফলাফলকে ক্ষুন্ন করবে না।’
অন্যদিকে বিরোধী দল ও আরব জোটের সমঝোতাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলে আখ্যা দিয়ে লিকুদ সতর্ক করে, জায়নবাদী দলগুলোর সঙ্গে আরব জোটের সহযোগিতা ‘ইসরায়েলের জন্য বিপজ্জনক’। এমনকি সম্ভাব্য এই শিবিরের বিরুদ্ধে রোববার রাতে আইজেনকোটের বাড়ির সামনে কয়েক ডজন লোক বিক্ষোভও করে।
আরব দলগুলো সরকারে না গিয়ে কেবল নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বিরোধীদের সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সোমবারের এক সাক্ষাৎকারে জয়েন্ট লিস্টের প্রধান জাবারিন জানান, তাদের দল বেন-গভির এবং স্মোটরিচের মতো চরমপন্থীদের হঠাতে পরিবর্তনকামী জোটকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত।
জাবারিন স্পষ্ট করেন, তারা সরাসরি জোটে যোগ দেবেন না বরং বাইরে থেকে ভোট দেবেন যাতে আইজেনকোট একটি ‘সংখ্যালঘুর সরকার’ গঠন করতে পারেন। তিনি দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘আইজেনকোট যেসব শর্তের কথা বলেছেন সেগুলো জোটে থাকা দলগুলোর জন্য প্রাসঙ্গিক। খুব স্পষ্ট কারণেই আমরা জোটে থাকার পরিকল্পনা করছি না... পশ্চিম তীরে আমাদের জনগণের ওপর দখলদারিত্ব চলা পর্যন্ত আমরা সরকারের অংশ হতে পারি না।’
নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল বুধবার সার্টিফাইড করা হবে এবং এরপর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ নেসেটে নির্বাচিত ১১টি দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থীকে জোট গঠনের আহ্বান জানাবেন। আইজেনকোট বা নেতানিয়াহু যে কাউকেই জোট গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় দেওয়া হবে, যা প্রয়োজনবোধে আরও ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে।
ক্ষমতার সমীকরণ মেলাতে আইজেনকোট ও নেতানিয়াহুর মধ্যে একতা সরকার গঠনের অতি ক্ষীণ সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি বিরোধী শিবির ভেঙে নেতানিয়াহুর আটজন সদস্য বাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও জারি রয়েছে। ইতোমধ্যে ইয়াশার পার্টি এক্সে জানিয়েছে যে লিকুদ থেকে তাদের কয়েকজন সদস্যকে ফোন করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক সমীকরণ যা-ই হোক না কেন, জোট গঠন শেষ না হলেও আগামী ১০ নভেম্বর নতুন এমপিদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
সূত্র: আল জাজিরা
