স্কুলের চেয়ে মৃত্যু কাছে, যুদ্ধের বিভীষিকায় ধুঁকছে ইয়েমেনের শিশুরা

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ২১:২৪

ইয়েমেনের তাইজ শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে একটি গ্রামে গত মাসে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে সন্তানদের নিয়ে পালানোর সুযোগ পাননি তাগরিদ আবদুল্লাহ। ততক্ষণে তাদের গ্রামেও শুরু হয়ে গেছে লড়াই। উপায় না দেখে চার, সাত ও ১০ বছর বয়সী তিন সন্তানকে নিয়ে ঘরের করিডোরে আশ্রয় নেন তিনি। উদ্দেশ্য, বিস্ফোরণ কিংবা জানালা ভেদ করে আসা গোলার টুকরো থেকে সন্তানদের রক্ষা করা।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইকে তাগরিদ বলেন, ‘তাদের বাবা তখন বাড়িতে ছিলেন না। শুধু আমি আর শিশুরা ছিলাম। বাইরে সংঘর্ষ চলছিল। আমাদের বাড়ির খুব কাছেই একটি বিস্ফোরণ ঘটে। এতে শিশুরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাঁদতে থাকে। আমি তাদের কান্না থামাতে পারছিলাম না। কখনো কখনো আমিও ভেঙে পড়ে তাদের সঙ্গে কাঁদতে শুরু করি।’

তাগরিদ জানান, লড়াই কিছুটা থেমে গেলে শিশুরাও কান্না থামাত। এ সময় কয়েকজন প্রতিবেশী তাদের বাড়িতে এসে শিশুদের সাহস জোগাতেন। কিন্তু আবার সংঘর্ষ শুরু হলেই তারা কাঁদতে শুরু করত। এভাবে চার দিন কাটানোর পর লড়াই তাদের এলাকা থেকে কিছুটা দূরে সরে যায়। তবে এর মধ্যেই সন্তানদের জীবনে বড় পরিবর্তন ঘটে গেছে।

তাগরিদ বলেন, সন্তানরা এখন প্রায়ই রেগে থাকে। ছোট দুই সন্তানের বিছানায় প্রস্রাব করার সমস্যা দেখা দিয়েছে। বড় সন্তানটি সারাক্ষণ নিজের মৃত্যুর কথা বলে। তার ধারণা, যেকোনো মুহূর্তে তাকে হত্যা করা হতে পারে। আগে পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবলেও এখন আর সেসব নিয়ে আগ্রহ নেই তার।

আগে সন্তানরা নিজেদের ঘরে ঘুমাত। কিন্তু সংঘর্ষ শুরুর পর থেকে একা ঘুমাতে ভয় পায় তারা। এখন পরিবারের সবাই একই ঘরে ঘুমায়। ছোট দুই সন্তান মায়ের কোলে ঘুমায়। তাগরিদ বলেন, রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে শিশুরা। দিনের বেলায়ও বাড়ির বাইরে যেতে চায় না। বাইরে গেলেই তাদের মনে হয়, হয়তো মারা যাবে কিংবা আহত হবে। এ কারণে সারাক্ষণ ঘরের ভেতরেই কাটায় তারা।

তাইজে সংঘর্ষ, বন্ধ স্কুল

নিরাপত্তার কারণে গত ৪ অক্টোবর থেকে ইয়েমেনের তাইজ গভর্নরেটের সরকারি স্কুলগুলো বন্ধ রয়েছে। তাইজ শহর ও গ্রামাঞ্চলের এসব স্কুলে শিশুদের যাওয়া নিরাপদ নয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বাইরে খেলাধুলা করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, এলাকার প্রায় প্রতিটি জেলায় চলছে গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলা।

তাগরিদও সন্তানদের বাইরে যেতে দিতে ভয় পান। তবে তিনি চান, শিশুরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরুক, বাইরে খেলাধুলা করুক এবং যুদ্ধের মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠুক।

তিনি বলেন, ‘জীবনে প্রথমবার আমি আমার সন্তানদের এতটা দিশাহারা দেখছি। তারা খেলতে চায় না, পড়াশোনা করতে চায় না। শুধু যুদ্ধের কথা বলে। স্বাভাবিক জীবন ফিরে এলেও এই অভিজ্ঞতা তাদের বাকি জীবনে প্রভাব ফেলবে কি না, তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন।’

গত ৪ অক্টোবর হুতি বাহিনী তাইজ গভর্নরেটের বিস্তীর্ণ এলাকায় অগ্রসর হয়। তারা গভর্নরেটের অধিকাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পাশাপাশি তাইজ শহরে যাওয়ার সব সড়ক দখল করে। বর্তমানে শহরের আশপাশ ও গ্রামাঞ্চলে লড়াই চলছে। আনুষ্ঠানিকভাবে আনসার আল্লাহ নামে পরিচিত হুতি বাহিনী তাইজ থেকে লাহিজ গভর্নরেটের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তাইজ শহরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ারও চেষ্টা চালাচ্ছে তারা।

তাইজের গ্রামাঞ্চল ও শহরের আশপাশে হুতি বাহিনীকে লক্ষ্য করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় ওই এলাকার শিশুরাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, সরকারপন্থী বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরুর পর চলতি বছরের আগস্ট থেকে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত ইয়েমেনজুড়ে ১ হাজার ৬৭৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৩৯৫ জনের বেশি।

তাইজ মানবাধিকার কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মাজেন আকলাম মিডল ইস্ট আইকে জানান, ২০২৬ সালের অক্টোবরে তাইজ গভর্নরেটে ১৯ শিশু নিহত এবং ৪৯ শিশু আহত হয়েছে।

শিশুদের মনে গভীর ক্ষত

তাইজ শহরের ১৩ বছর বয়সী ওদাইয়ের জীবনও বদলে গেছে যুদ্ধের কারণে। আগে সকালে স্কুলে যেত সে, আর বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করত। কিন্তু গত ৪ অক্টোবরের পর থেকে দিনের বেশির ভাগ সময় ও রাতের একটি বড় অংশ মোবাইল ফোনে কাটছে তার। বাড়ির কাছের একটি গাছের নিচে বন্ধু ও বড়দের সঙ্গে বসতে মাঝেমধ্যে অল্প সময়ের জন্য বাইরে যায়।

তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, মোবাইল ফোনে দেখা ছবি ও ভিডিও এবং বড়দের কাছ থেকে শোনা যুদ্ধের গল্প তার মনে গভীর প্রভাব ফেলছে। ২০১৫ সালে তাঁদের এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার সময় বেসামরিক মানুষ, এমনকি শিশুরাও নিহত ও আহত হয়েছিল। সেসব ঘটনার গল্প ও ছবি এখন ওদাইয়ের কৌতূহলের বিষয়।

মিডল ইস্ট আইকে ওদাই বলে, ‘জীবন সহজ নয়, আর মৃত্যু যেন সবার খুব কাছেই। আমরা পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলাম, কিন্তু জানতাম না যে এক মুহূর্তের মধ্যেই কারও জীবন শেষ হয়ে যেতে পারে।’

সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ওদাইকে বয়সের তুলনায় পরিণত মনে হয়। কিন্তু চলমান সংঘাত ও চারপাশের মানুষের কাছ থেকে শোনা গল্প তার চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন এনেছে। পড়াশোনার চেয়ে এখন মৃত্যু ও পরকালের চিন্তা তাকে বেশি ভাবায়।

পড়াশোনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত কি না, জানতে চাইলে ওদাই বলে, ‘পড়াশোনা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্কুল খোলার আগ পর্যন্ত আমরা বেঁচে থাকব কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। পড়াশোনা আবার শুরু হওয়ার চেয়ে মৃত্যু আমাদের বেশি কাছে।’

মিডল ইস্ট আইয়ের সঙ্গে কথা বলেছেন ওদাইয়ের বাবাও। পঞ্চাশোর্ধ্ব এই ব্যক্তি নাম প্রকাশ করতে চাননি। তিনি জানান, গত মাসের আগ পর্যন্ত ছেলের আচরণ এমন ছিল না। শহরে এক শিশুর নিহত হওয়ার ঘটনা সম্পর্কে জানার পাশাপাশি এ-সংক্রান্ত ছবি ও ভিডিও দেখার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে ওদাই।

ওদাইয়ের বাবা বলেন, ‘আমরা সন্তানদের সংঘর্ষ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করি। তাদের বাড়িতে রাখি, দূরে কোথাও যেতে দিই না। কিন্তু এমন পরিবেশে একটি শিশুর মানসিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন।’

তিনি আরও বলেন, মোবাইল ফোন ও বন্ধুদের কাছ থেকে শোনা গল্প শিশুদের মনে গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নিহত শিশুদের ছবি দেখার পর তাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। এসব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা অভিভাবকদের পক্ষে কঠিন। ভয়াবহ দৃশ্যগুলো শুধু শিশুদের নয়, প্রাপ্তবয়স্কদেরও মানসিকভাবে প্রভাবিত করছে। তাই এই সময়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও সংস্থাগুলোর দ্রুত মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

যুদ্ধের সময় অভিভাবকেরা সাধারণত সন্তানদের শারীরিক নিরাপত্তা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন থাকেন। কিন্তু তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অনেকেই গুরুত্ব দেন না। অথচ এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে বলে মনে করেন ওদাইয়ের বাবা।

প্রয়োজনের তুলনায় সহায়তা কম

তাইজ মানবাধিকার কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মাজেন আকলাম বলেন, গভর্নরেটটিতে এক লাখের বেশি শিশু যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছে। গোলাবর্ষণ, বিস্ফোরণ ও নানা মর্মান্তিক ঘটনার কারণে তারা মানসিক আঘাতের শিকার। এসব শিশুর জরুরি ভিত্তিতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন।

যেসব পরিবার স্বজন হারিয়েছে, যাদের বাড়িতে গোলাবর্ষণ হয়েছে, যারা বাস্তুচ্যুত হয়েছে কিংবা সরাসরি যুদ্ধের পরিণতির শিকার হয়েছে, সেসব পরিবারের শিশুদের মানসিক সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

সাম্প্রতিক উত্তেজনা শুরুর আগে গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছিল, মাত্র দুই সপ্তাহে ৫৭ হাজারের বেশি শিশু বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

তাইজ মানবাধিকার কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, গভর্নরেটটিতে এক লাখের বেশি শিশুর মানসিক সহায়তা প্রয়োজন। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা শুরুর আগে চলতি বছরের শুরুতে জাতিসংঘ জানিয়েছিল, পুরো ইয়েমেনে ১ কোটি ২২ লাখ শিশুর মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।

তাইজ গভর্নরেটের সমাজকল্যাণ ও শ্রম দপ্তর গত রোববার জানিয়েছে, সেখানে কাজ করা বেসরকারি মানবিক সংস্থাগুলো ৭১৯ শিশুকে মানসিক-সামাজিক সহায়তা দিয়েছে। এ ছাড়া ২১৯ জন ছেলে ও মেয়ে শিশুকে প্রাথমিক মানসিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

ঝুঁকিতে শিশুদের ভবিষ্যৎ

তাইজে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করা মনোবিজ্ঞানী সাবা আল-সাবরি জানান, গত এক মাসে শিশুদের আচরণে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা গেছে। অন্যদের সঙ্গে মিশতে না চাওয়া, স্বজন হারানোর শোক, সব সময় ভয়ে থাকা, অস্থিরতা, বিছানায় প্রস্রাব করা এবং ঘুমের মধ্যেও মা-বাবাকে আঁকড়ে ধরে থাকার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে তাদের মধ্যে।

সাবা আল-সাবরি বলেন, অনেক শিশু পড়াশোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। তাদের ধারণা, পড়াশোনা করতে গেলে হয়তো তারা মারা যাবে অথবা পঙ্গু হয়ে যাবে। এসব অভিজ্ঞতা শিশুদের ভবিষ্যৎকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

তিনি জানান, গত ১১ বছরের বেশি সময় ধরে ইয়েমেনে যুদ্ধ চলছে। এ সময়ে শিশুদের মানসিক সহায়তার প্রয়োজন থাকলেও মানবিক সংস্থা ও বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে যে পরিমাণ কাউন্সেলিং দেওয়া হচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে আরও অনেক শিশু মানসিক সহায়তার প্রয়োজনীয় তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

সাবা আল-সাবরির মতে, অনেক অভিভাবক শিশুদের মানসিক আঘাতের গভীরতা বুঝতে পারেন না। তাঁরা মূলত সন্তানদের বেঁচে থাকা ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু শিশুদের অনুভূতিকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং তাদের সঙ্গে কথা না বলার নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

শিশুদের স্বাভাবিকভাবেই খেলাধুলা ও বাইরে চলাফেরার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে দীর্ঘ সময় ঘরে আটকে থাকায় তাদের মানসিক চাপ ও অস্থিরতা বাড়ছে। এতে ব্যক্তিত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মেজাজেরও অবনতি হচ্ছে বলে জানান এই মনোবিজ্ঞানী।

এদিকে তাগরিদ আবদুল্লাহও মনে করেন, সন্তানদের মানসিক চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে সেই সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলে আমি অবশ্যই সন্তানদের সেখানে নিয়ে যেতাম। কিন্তু এখন যুদ্ধ চলছে। এ ধরনের সেবা সাধারণত শহরেই পাওয়া যায়। তাই আমাদের পক্ষে তা নেওয়া কঠিন।’

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

ইত্তেফাক/এবিএস