বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন উজ্জ্বল

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:১৭

হাত-পা অচল, কথাও বলতে পারেন না, এমন বহুমাত্রিক শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ভালোভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন রংপুরের নিভৃতপল্লির এক যুবক জুবায়ের হোসেন উজ্জ্বল। হাত-পা কাজ না করায় মুখই হয়ে উঠেছে তার শরীরের সর্বাধিক কর্মক্ষম অঙ্গ। মুখ দিয়ে কলম ধরে চলেছে লেখাপড়া। এখন পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে কর্মজীবনে নিজেকে উপযোগী করে গড়ে তুলতে ব্যস্ত ২৬ বছর বয়সি উজ্জ্বল।

মুখে কাঠি ধরে ল্যাপটপে কাজ করছেন উজ্জ্বল। কখনো কার্সর নাড়াচ্ছেন, কখনো কি-বোর্ডে টাইপসহ নানা অনলাইন ও দাপ্তরিক কাজ শিখছেন তিনি। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া অদম্য উজ্জ্বল নিজের বিছানাকেই শ্রেণিকক্ষ বানিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। মুখ দিয়ে বইয়ের পৃষ্ঠা উলটানোসহ মুখে কলম ধরে লেখেন খাতায়। এভাবেই এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফলাফল করেন তিনি। উজ্জ্বলের ইচ্ছে ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার। তবে বর্তমানে জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার বালারহাট ডিগ্রি কলেজে ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়ন করছেন তিনি।

রংপুর নগরী থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে মিঠাপুকুর উপজেলার বালারহাট ইউনিয়নের অজোপাড়া গাঁ হযরতপুর গ্রামের বাসিন্দা উজ্জ্বল ছোটবেলা থেকে শারীরিক ও বাক্প্রতিবন্ধী হয়ে বেড়ে উঠেছেন। তার  কঠিন ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মেনেছে তার শারীরিক প্রতিবন্ধকতা।

কৃষক বাবা জাহিদ সরোয়ারের তৃতীয় সন্তান উজ্জ্বলের বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা ধরা পড়ে ছোটবেলাতে। দীর্ঘ ১০ বছর শিশু উজ্জ্বলকে নিয়ে ছোটেন চিকিত্সক, কবিরাজ আর থেরাপিস্টের কাছে। চিকিত্সায় উজ্জ্বলের মুখ দিয়ে লালা ঝরা বন্ধ হওয়া ছাড়া শরীরের তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। কিন্তু উজ্জ্বলের স্মরণশক্তি ছিল প্রখর। ছোটবেলায় ছোট বোনকে পড়ানোর সময় শুনে শুনে তার পড়া রপ্ত করে ফেলত উজ্জ্বল। বিষয়টি বুঝতে পেরে উজ্জ্বলকে স্কুলে ভর্তি করান তিনি। সারা দিন বাড়িতে শুয়ে লেখাপড়া করে উজ্জ্বল। পরীক্ষার সময় বাবা কোলে করে স্কুলে নিয়ে যান এবং পরীক্ষাকেন্দ্রে শুয়ে শুয়ে মুখ দিয়ে পরীক্ষার খাতায় লেখেন উজ্জ্বল। এভাবে স্থানীয় শেরপুর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে জিপি ৪ দশমিক ৩৩ পয়েন্ট অর্জন করেন উজ্জ্বল। এরপর ২০২২ সালে মিঠাপুকুরের বালারহাট আদর্শ ডিগ্রি মহাবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ- ৪ দশমিক ৫৮ পেয়েছেন।

উজ্জ্বলের বাবা জাহিদ সারোয়ার জানান, করোনাকালীন এইচএসসি ফল প্রকাশের আগেই বিয়ে হয়ে গেছে উজ্জ্বলের ছোট বোনের। বড় ভাই এনজিওতে চাকরির সুবাদে পরিবার নিয়ে থাকেন সিলেটে। তাই তিনিই এখন উজ্জ্বলের দেখাশুনা করেন। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন তিনি। এখন উজ্জ্বলের চিকিত্সা ও লেখাপড়ার খরচ যোগাতে নিঃস্ব প্রায় পরিবার। উজ্জ্বলের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক রংপুর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে নুসরাত ফাতেমা বলেন, ‘উজ্জ্বলের মতো মেধাবীরা পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পরিবারের বোঝা নয়, পরিণত হবেন জনসম্পদে।’

 

ইত্তেফাক/এনএন