রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন সাব্বির প্রামাণিক। একসময় রাজপথে জামায়াত-শিবিরের সক্রিয় কর্মী ছিলেন তিনি। সহিংসতায় গুরুতর আহত হয়ে শরীরে অস্ত্রোপচার করাতে হয়, দিতে হয় ৬৪টি সেলাই। দীর্ঘ চিকিৎসার পর প্রাণে বাঁচলেও স্বাভাবিক জীবনে ফেরা সহজ হয়নি তার। অসুস্থ শরীর নিয়েই কখনো অটোরিকশা চালিয়ে, আবার কখনো মানুষের কাছে সাহায্য চেয়ে জীবিকা চালানোর চেষ্টা করেছেন।
চাকরির আশায় ছুটেছেন নিজের রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের কাছেও। সংগঠনটির আমির ডা. শফিকুর রহমানকে লিখেছেন খোলা চিঠি। তবু মেলেনি প্রত্যাশিত সহযোগিতা।
১৩ বছর ধরে এমনই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দিন কাটছিল সাবেক শিবিরকর্মী সাব্বির প্রামাণিকের। অবশেষে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার অসহায়ত্ব ও জীবনসংগ্রামের খবর প্রকাশের পর বদলে যায় পরিস্থিতি। তার পাশে দাঁড়ান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। নিজের প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার পদে চাকরির ব্যবস্থা করে দেন তিনি।
জানা গেছে, সাব্বিরের জীবনসংগ্রাম নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে বিষয়টি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নজরে আসে। প্রতিবেদনটি দেখেই তিনি তার কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেন। বর্তমানে সাব্বির পুষ্টি চালের মিল, সিমেন্টের ইট তৈরির কারখানা ও মাছের খামার দেখাশোনার পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানের হিসাব নিকাশের দায়িত্ব পালন করছেন। ম্যানেজার হিসেবে তাকে সম্মানজনক পদ ও ভালো বেতন দেওয়া হচ্ছে।
চাকরি পেয়ে আবেগাপ্লুত সাব্বির বলেন, আমি অনেকবার জামায়াতের কাছে চাকরির জন্য গিয়েছি। কিন্তু তারা আমাকে চাকরি দেয়নি। মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম আমাকে চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ভালো বেতন দিচ্ছেন। এখন আল্লাহ আমাদের পরিবারকে ভালো রেখেছেন। আমরা অনেক স্বস্তিতে আছি।
সাব্বিরের জীবনের সেই কালো অধ্যায়ের শুরু ২০১৩ সালের ৩১ জানুয়ারি। ওই দিন বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজ এলাকায় রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হন তিনি। হামলায় তার সহকর্মী শিবির নেতা আবু রুহানী নিহত হন।
সাব্বিরের দাবি, হামলাকারীরা তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। হার্ট, ফুসফুস, কিডনিসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে অস্ত্রোপচার করতে হয়। শরীরে দিতে হয় ৬৪টি সেলাই। একপর্যায়ে সংবাদপত্রে তাকে মৃত হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসেন তিনি।
জীবন ফিরে পেলেও স্বাভাবিক জীবনে ফেরা সহজ হয়নি সাব্বিরের। দীর্ঘ চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হলেও শরীরের নানা জটিলতা তাকে কর্মক্ষম হতে বাধা দেয়। পরিবারের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দিতে অসুস্থ শরীর নিয়েই অটোরিকশা চালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কাছে হার মানতে হয় তাকে। একদিকে নিজের চিকিৎসার খরচ, অন্যদিকে পরিবারের ভরণপোষণ সব মিলিয়ে প্রতিটি দিনই হয়ে ওঠে কঠিন সংগ্রামের।
একসময় যে সংগঠনের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, দুঃসময়ে সেই সংগঠনের নেতাদের কাছেই সহযোগিতার আশায় বারবার ছুটেছেন সাব্বির। নিজের অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের উদ্দেশে লিখেছেন খোলা চিঠি। সেখানে সংগঠনের জন্য কাজ করার পরও বিপদের সময়ে যথাযথ চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের সহযোগিতা না পাওয়ার কথা তুলে ধরেন। চাকরির জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করেও কার্যকর সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ তার। বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত চাকরির ব্যবস্থা করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
দীর্ঘদিনের সেই হতাশা আর অনিশ্চয়তার পর এখন নতুন করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে সাব্বিরের পরিবার। পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাশা, এই চাকরির মধ্য দিয়ে আর্থিক সংকট কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন তিনি।
রাজনীতির পরিচয় ও দলীয় বিভেদের বাইরে একজন বিপর্যস্ত মানুষের কর্মসংস্থানের আকুতিতে সাড়া দেওয়ার ঘটনাটি ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে। যে সাব্বির নিজের রাজনৈতিক সংগঠনের শীর্ষ নেতার কাছে চিঠি লিখেও সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন, গণমাধ্যমে তার দুর্দশার কথা প্রকাশের পর পাশে দাঁড়িয়েছেন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী। দীর্ঘ ১৩ বছরের কষ্টের জীবনে এই চাকরি যেন সাব্বিরের কাছে শুধু কর্মসংস্থান নয়, নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর এক টুকরো আশার আলো।
